ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
মঙ্গলবার ২৩ জুন ২০২৬ ৮ আষাঢ় ১৪৩৩
বকের ছানার প্রতি হেমায়েতের মায়া তারপর দূর্বল আইনের শীতলতা
মোঃ আল আমিন আকন
প্রকাশ: Thursday, 30 October, 2025, 1:26 PM

বকের ছানার প্রতি হেমায়েতের মায়া তারপর দূর্বল আইনের শীতলতা

বকের ছানার প্রতি হেমায়েতের মায়া তারপর দূর্বল আইনের শীতলতা

ঝড়ের এক বিকেল আকাশ কালো, বাতাসে ধুলোর ঘূর্ণি। গাছের ডালে তখনও ভিজে ডানা মেলে বসেছিল এক বকের ছানা নবজাত, নরম পালকের মতো নিস্পাপ। হঠাৎ এক ঝটকায় ভাঙা ডালসহ ছিটকে পড়ে যায় নিচে। কাতর, রক্তাক্ত, অসহায়।

সেই সময় পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন স্থানীয় দোকানদার হেমায়েত উদ্দিন। হঠাৎই চোখে পড়ে ভয়াল দৃশ্য একটি গুইসাপ আহত ছানাটিকে কামড়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ঝোপের দিকে। মুহূর্তের মধ্যে যেন মানবিকতার স্রোত বইতে থাকে তার বুকজুড়ে। প্রাণপণে দৌড়ে গিয়ে তিনি গুইসাপটিকে তাড়িয়ে দেন, নিজের হাতেই তুলে নেন কাঁপতে থাকা সেই প্রাণটিকে।

প্রথমে এটি ছিল কেবল একটি নৈতিক দায়বদ্ধতা একটি আহত প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা। কিন্তু দিন গড়াতে গড়াতে সেই দায়বদ্ধতা পরিণত হয় মমতায়, আর মমতা রূপ নেয় এক অদ্ভুত সম্পর্কের বন্ধনে।

হেমায়েতের দোকানের এক কোণে জায়গা হয় ছোট্ট অতিথির। নাম দেন “বকু”। গ্রাহক এলে বকু মাথা তুলে তাকায়, হেমায়েত খাবার খেলে তার কাঁধে উঠে আসে, ঠোঁট দিয়ে আলতো টোকা দেয়। তাদের মধ্যে তৈরি হয় এক নীরব বোঝাপড়া যেন ভাষাহীন এক বন্ধুত্ব।

দোকানের নিয়মিত ক্রেতারা সেই খুনসুটি উপভোগ করতেন। মানুষের কোলাহল শেষে যখন বাজার নিস্তব্ধ হয়ে যেত, তখন দোকানে দেখা যেত এক মানুষ আর এক বকের ছানার মায়াভরা সান্নিধ্য। হেমায়েত উদ্দিনের চোখে তখন ছিল পিতৃত্বের মমতা, আর বকুর চোখে ছিল নির্ভরতার নিশ্চয়তা।

ফেসবুকে খুনসুটি, তারপর ঝড় একদিন সেই আনন্দঘন মুহূর্তগুলোর কিছু ভিডিও হেমায়েত পোস্ট করলেন ফেসবুকে। উদ্দেশ্য ছিল স্রেফ মমতার গল্প ভাগ করে নেয়া মানুষের ভালোবাসায় বেঁচে ওঠা এক ছোট প্রাণের কাহিনি।

কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া নামক আধুনিক বাতাসে মমতার গল্পও কখনো কখনো ঝড় ডেকে আনে। ভিডিওটি নজরে আসে কিছু স্থানীয় সাংবাদিকের। তারা ভালো উদ্দেশ্যেই গল্পটি তুলে ধরেন শিরোনাম করে মানুষের ভালোবাসায় বড় হচ্ছে বকের ছানা!” এরপর যা হওয়ার তাই হলো ভিডিও ভাইরাল। উপজেলা থেকে জেলা, জেলা থেকে জাতীয় গণমাধ্যম সবখানেই হেমায়েত ও বকুর মায়ার গল্প ছড়িয়ে পড়ে। ভালোবাসার গল্প হয়ে ওঠে কনটেন্ট আর এক নিঃস্বার্থ সম্পর্ক পরিণত হয় প্রশাসনিক নজরদারিতে।

আইনের প্রয়োগে সম্পর্কের ইতি সংবাদটি পৌঁছায় বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কর্মকর্তাদের টেবিলে। তাদের চোখে বিষয়টি আইনভঙ্গের সমান বন্যপ্রাণী বন্দি রাখা অপরাধ। আইন অনুযায়ী তাই অভিযান চলে। দোকান থেকে উদ্ধার করা হয় বকু যাকে হেমায়েত নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছিলেন। হেমায়েতের চোখে তখন ঝরে পড়ে নিঃশব্দ অশ্রু। তিনি বলেন আইনের প্রতি সম্মান রেখেই ওকে ছাড়তে বাধ্য হয়েছি। কিন্তু ও ছোট থেকে আমার কাছে। উড়তে জানে না, শিকার ধরতে জানে না, নিজের জাতের সঙ্গে থাকতে জানে নাও কিভাবে বাঁচবে? বন কর্মকর্তারা হয়তো দায়িত্ব পালন করেছেন, কিন্তু সেই মুহূর্তে মানবিকতার পরাজয় ঘটেছে শীতল আনুষ্ঠানিকতার কাছে।

মানবিকতা, প্রচার ও দায়সারা দায়িত্ব এই একটি ঘটনাই যেন সমাজের তিনটি মুখ সামনে এনে দিয়েছে মানবিকতার উজ্জ্বল উদাহরণ,
মিডিয়ার অতিরঞ্জিত প্রচার, আর রাষ্ট্রীয় আইনের দায়সারা বাস্তবায়ন।

আহত প্রাণকে বাঁচাতে এগিয়ে যাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বদলে, সমাজ তার আবেগকেই পরিণত করেছে ভাইরাল বিনোদনে।
আর প্রশাসন, আইন মানতে গিয়ে হয়তো ভুলে গেছে ওই বাজারের কোণে বেড়ে ওঠা আল আমিনের বাঁধাহীন আইনের কথা  “সব আইনই সঠিক নয়, যদি তা মমতার ভাষা না বোঝে”


পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status