বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ তরুণী শামীমা বেগম। বয়স মাত্র ১৯ বছর। ২০১৫ সালের শুরুর দিকে বেথনাল গ্রিন একাডেমির ক্লাস নাইনে পড়াশোনার সময় অনলাইনে আইএসের 'মগজধোলাই'-এর শিকার হন। পরিবারকে ফাঁকি দিয়ে শামীমা ও তার সহপাঠী আরেক ব্রিটিশ-বাংলাদেশি খাদিজা সুলতানাসহ তিন তরুণী আইএসে যোগ দিতে তুরস্ক হয়ে সিরিয়ায় পাড়ি দেন। বিয়ে করেন এক আইএস যোদ্ধা। সিরিয়া থেকে আইএস বিতারিত হওয়ার পর বর্তমানে গর্ভে অনাগত সন্তানসহ আশ্রয় নিয়েছেন শরণার্থী শিবিরে।
ব্রিটিশ সাংবাদিক অ্যান্থোনি লয়েড জাতিসংঘ পরিচালিত ওই শরানার্থী শিবিরে শামীমা বেগমের দেখা পান এবং তার একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। লন্ডনের ডেইলি মেইল, লন্ডন টাইমস, ইউকে এক্সপ্রেস, ইউকে মিররসহ আরও বেশকয়েকটি পত্রিকায় সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ হয়েছে। পিতামহের সঙ্গে খুব ছোট বেলায় বাংলাদেশ ছেড়ে লন্ডনে স্থায়ীভাবে চলে যাওয়া এই তরুণীর সাক্ষাৎকারটির অংশবিশেষ পূর্বপশ্চিমের পাঠকের জন্য।
যে কারণে দেশে ফিরতে চান
সাক্ষাৎকারের শুরুতেই শামীমা জানান, আইএসে যোগ দিতে সিরিয়ার আসার জন্য অনুতাপ নেই তার। নিজেকে নিয়েও ভাবেন না তিনি। গর্ভের অনাগত সন্তানের জন্যই তার যতো চিন্তা। অনাগত সেই শিশুটির সুন্দর ভবিষ্যতের জন্যই লন্ডনের বেথনাল অ্যান্ড গ্রিন এলাকায় পরিবারের কাছে ফিরতে চান তিনি।
শামীমা বলেন, আমি এখন নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। যেকোনো দিন আমার সন্তানের জন্ম হতে পারে। এর আগেও আমি মা হয়েছিলাম। কিন্তু অপুষ্টি আর রোগে ভুগে জন্মের কয়েক মামের মধ্যে তাদের মৃত্যু হয়। নবাগত সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখতেই আমি লন্ডন ফিরতে চাই।
আইএসে যোগ দেওয়া শামীমা দেশে ফিরতে চান
কোথায় অন্য দুই বান্ধবী
চার বছর আগে যুক্তরাজ্যের পূর্ব লন্ডনের স্কুলপড়ুয়া তিন বান্ধবীর একসঙ্গে নিখোঁজ হওয়া নিয়ে তুমুল হইচই পড়ে যায়। তিন দিন পর জানা যায়, তাঁরা জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে সিরিয়ায় পাড়ি দিয়েছেন। বেথনাল গ্রিন একাডেমির তিন ছাত্রীর মধ্যে শামীমা বেগম ও আমিরা আবাসির বয়স ছিল ১৫ বছর। অপর ছাত্রী খাদিজা সুলতানা ছিলেন ১৬ বছর বয়সী। তাঁদের তিন মাস আগে একই বিদ্যালয়ের ছাত্রী শারমিনা বেগম সিরিয়ায় পাড়ি দিয়েছিলেন। বাসায় ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে গ্যাটউইক বিমানবন্দর থেকে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে আসেন তারা। সেখান থেকে সীমান্ত পেরিয়ে চলে যান সিরিয়ায়।
শারমিনার সঙ্গে যোগাযোগের সূত্র ধরেই তিন মেয়ে একসঙ্গে সিরিয়ায় পাড়ি দেন বলে শামীমা জানিয়েছেন। শামীমা বেগম, খাদিজা সুলতানা ও শারমিনা বেগম—এই তিনজনেই বাংলাদেশি পরিবারের সন্তান।
২০১৬ সালে আইএস জঙ্গিদের ওপর বোমা হামলায় খাদিজা নিহত হয়েছেন বলে শামীমা জানিয়েছেন। তবে আমিরা আব্বাসি নামের তাদের অপর বান্ধবীর ভাগ্যে কী ঘটেছে তা তিনি জানেন না। দুই বছর আগে তার সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল।
ধর্মান্তরিত ডাচ-যোদ্ধাকে বিয়ে
সিরিয়ায় আইএস ঘাঁটিতে পৌছার মাত্র ১০ দিন পরেই ২৭ বছর বয়সী ডেনমার্কের ধর্মান্তরিত এক ছেলের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। এ প্রসঙ্গে শামীমা বেগম জানান, সিরিয়ায় প্রবেশ করে তাঁরা সরাসরি রাক্কায় চলে যান। আইএসে অবিবাহিত মেয়েদের যোগ দেওয়ার সুযোগ নাই। তাই নিয়ম অনুযায়ী রাক্কায় একটি ভবনে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা তরুণীদের একসঙ্গে রাখা হয় বিয়ে দেওয়ার জন্য। শামীমার কাছে জানতে চাওয়া হয়, কি ধরনের পাত্র তার পছন্দ?
তিনি বলেন, আমি ২০ থেকে ২৫ বছরের একজন ইংরেজি ভাষী যোদ্ধাকে বিয়ে করার আবেদন জানিয়েছিলাম। সিরিয়ার রাক্কা শহরে পা রাখার ১০ দিন পরই আমার বিয়ে হয়ে যায়। আমার স্বামীর দেশ ছিল ডেনমার্ক। সে ডাচ ভাষাতেই কথা বলতো। পাশাপাশি ভাঙা ভাঙা ইংরেজি জানতো। ওটা আমাকে আরও আকরর্ষণ করেছিল। অল্প সময়েই ভিন্ন জায়গা ভিন্ন পরিবেশ থেকে আসা আমরা একে অন্যের সঙ্গে বেশ ভালোই মানিয়ে চলতে শিখে যাই।
ওই সময় আইএস জঙ্গিরা সিরিয়া ও ইরাকের বিশাল একটি অংশ দখল করে ইসলামি খেলাফত রাষ্ট্র ঘোষণা করেছিল। যার রাজধানী ছিল সিরিয়ার রাক্কা শহর। ওই শহরেই স্বামীর সঙ্গে থাকতেন শামীমা। সিরিয়ার পূর্বাঞ্চলে আইএসের সর্বশেষ দখলে থাকা শহর বাঘুজ থেকে দুই সপ্তাহ আগে পালান এই দম্পতি।পরে আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইরত সিরীয় যোদ্ধাদের একটি গ্রুপের কাছে আত্মসমর্পণ করেন শামীমার স্বামী। আর তার আশ্রয় হয়েছে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের এই ক্যাম্পে, যেখানে আশ্রয় নিয়েছেন ৩৯ হাজার মানুষ।
শিরশ্ছেদ করা মুন্ডু দেখে বিচলিত হননি
জীবনে প্রথমবার দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন মাথা দেখার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে শামীমা বলেন, একটি ময়লার ঝুঁড়িতে প্রথমবার শিরশ্ছেদ করা মুন্ডু দেখি। তবে তাতে খুব একটা খারাপ লাগেনি। বিচলিতও হ্ইনি। কারণ সেটা ছিল যুদ্ধের ময়দানে ধরা পড়া একজনের, একজন ইসলামের শত্রুর। সুযোগ পেলে একজন মুসলিম নারীকে সে কী করত, আমি শুধু তাই ভেবেছিলাম।
তিনি জানান, তার যোদ্ধা স্বামী বহুবার লড়াইয়ে গেলেও তাকে নিয়ে যাননি। প্রতিবার লড়াইয়ে যাওয়ার আগে তিনি মানসিক প্রস্ততি নিয়ে রাখতেন, স্বামী হয়তো তার আর নাও ফিরে আসতে পারে। সিরিয়ায় তাঁর প্রত্যাশিত জীবন পেয়েছিলেন কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে শামীমা বলেন, রাক্কা শহরে তিনি প্রত্যাশিত জীবন যাপনই করছিলেন। যখন তখন বোমা হামলার ঘটনাগুলো বাদ দিলে সেখানে জীবন ছিল স্বাভাবিক।
সন্তান হারা মায়ের কান্না
সিরিয়ায় আসার পরশামীমার জীবনের সবচেয়ে বড় বেদনাদায়ক ঘটনা হলো, দুই সন্তানের মৃত্যু। এখনও অকালে মারা যাওয়া দুই শিশুর কথা ভেবে প্রায়ই কাঁদেন। দুই সন্তানের মৃত্যুর কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এটা ছিল খুব কষ্টের। প্রথম সন্তান মেয়ে মারা গেছে এক বছর নয় মাস বয়সে, এক মাস আগেই বাঘুজে তাকে কবর দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় সন্তান মারা গেছে তিন মাস আগে। অপুষ্টিজনিত অসুস্থতায় আট মাসের ওই শিশুর মৃত্যু হয়।
শামীমা জানান, তিনি সন্তানকে একটি হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে কোনো ওষুধ ছিল না। ছিল না পর্যাপ্ত চিকিৎসক-নার্সও। সে কারণেই এখন অনাগত সন্তানকে নিয়ে তিনি বেশি ভাবছেন। তিনি বলেন, ‘এখন আমি ঘরে ফিরে আমার সন্তানকে নিয়ে শান্তভাবে বেঁচে থাকতে যা করতে হয়, তা-ই করবো।
যুক্তরাজ্যে ফিরে তিনি সন্তানকে নিয়ে নীরব জীবনযাপন করতে চান। যুক্তরাজ্যে ফেরার জন্য তিনি সবকিছু করতে রাজি।
বদলে যাওয়া শামীমা
অপ্রাপ্তবয়সে ঝোঁকের মাথায় আইএসে ফাঁদে পা রেখে সিরিয়া আসেন শামীমা বেগম। এ নিয়ে তার মধ্যে কোনো অনুতাপ নেই। এখন নিজেকে তিনি অনেক পরিণত দাবি করে বলেন, চার বছর আগে যে ১৫ বছরের বোকা ছোট স্কুলবালিকা বেথনাল গ্রিন থেকে পালিয়ে এসেছিল, আমি আর এখন তেমনটি নই। সবকিছুই এখন বিচার বিশ্লেষণ করতে পারি। এটা বুঝতে পারছি যে, আইএসের খেলাফত এখন শেষের পথে। ‘আমার আর বড় কোনো আশা নেই। তারা শুধু ছোট থেকে ছোটই হচ্ছে। এত বেশি দমন-পীড়ন ও দুর্নীতি চলছে যে, আমি মনে করি না, তারা জয়ী হতে পারবে।
শামীমাকে কি গ্রহণ করবে ব্রিটেন?
ব্রিটিশ নাগরিক শামীমা বেগমের লন্ডন ফিরে আসার পথটা মোটেও চওড়া নয়। শামীমার দেশে ফেরা প্রসঙ্গে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেসবিস জানান,, শামীমার যুক্তরাজ্যে ফিরে আসার অধিকার আছে। তবে তাঁকে ইরাক, তুরস্ক বা ওই অঞ্চলের অন্য কোনো ব্রিটিশ দূতাবাসে গিয়ে সাহায্য চাইতে হবে। কারণ সিরিয়ায় কোনো ব্রিটিশ কনস্যুলার সেবা নেই
পাশাপাশি তিনি আরও বললেন, যে ব্রিটিশ নাগরিকই আইএসে যোগ দিতে বা তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার জন্য সিরিয়ায় গেছেন, তারা যুক্তরাজ্যে ফিরলে জিজ্ঞাসাবাদ, তদন্ত ও সম্ভাব্য বিচারের মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
শামীমার মতো বিপথগামীদের ফিরিয়ে আনতে সরকার পদক্ষেপ নেবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, সন্ত্রাসী বা সাবেক সন্ত্রাসীদের খুঁজে বের করতে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পাঠিয়ে আমি ব্রিটিশ জনগণের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে পারি না।