ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
বুধবার ৬ মে ২০২৬ ২২ বৈশাখ ১৪৩৩
বরগুনায় সংরক্ষিত বনভূমি দখল, প্রকল্পে টাকা ভাগাভাগি, বন বিভাগে ফলছে দুর্নীতির বিষফল
তামান্না জেনিফার, বরগুনা
প্রকাশ: Tuesday, 29 July, 2025, 2:45 PM

বরগুনায় সংরক্ষিত বনভূমি দখল, প্রকল্পে টাকা ভাগাভাগি, বন বিভাগে ফলছে দুর্নীতির বিষফল

বরগুনায় সংরক্ষিত বনভূমি দখল, প্রকল্পে টাকা ভাগাভাগি, বন বিভাগে ফলছে দুর্নীতির বিষফল

বন শুধু গাছের ঘনত্ব নয়, তা একটি জীবন্ত জৈবসমষ্টি প্রকৃতির ফুসফুস। এটি রক্ষা করে নদী, পাহাড়, বৃষ্টি আর বাতাসের ভারসাম্য। বন নিঃশব্দে আমাদের দেয় শ্বাস নেওয়ার অক্সিজেন, প্রাণীদের আশ্রয়, জলবায়ুর ভারসাম্য এবং দুর্যোগ থেকে রক্ষা করার শক্তি। এই গাছগাছালির মাঝেই জন্ম নেয় পাখির গান, শিশুর হাসি আর মানুষের টিকে থাকার সম্ভাবনা। অথচ সেই বন আজ ব্যবসা আর দুর্নীতির নখরে নিঃশেষ হচ্ছে। বরগুনা ও পটুয়াখালীর উপকূলীয় বনাঞ্চলে চলছে কোটি টাকার সবুজ হত্যার নিষ্ঠুর উৎসব।

বন উজাড়ের উৎসবে সরকারি চক্রান্ত!
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বরগুনা ও পটুয়াখালীর বেশিরভাগ সংরক্ষিত বনভূমিতেই প্রতিদিনই কাটা হচ্ছে শত শত গাছ। বন সংরক্ষণের আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলছে ভুয়া উন্নয়ন প্রকল্প, অবৈধ করাতকল স্থাপন, সড়ক নির্মাণ আর ঘের ও খামার বসানোর মহোৎসব। এসব কাজ বনবিভাগের সহায়তা বা নীরব সম্মতিতে বাস্তবায়িত হচ্ছে, এমন অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের।

বিশেষ করে বরগুনার সদরের কুমীরমারা, গোড়াপদ্মা, নিশানবাড়িয়া, পাথরঘাটার চরদুয়ানী, আমতলী ও তালতলী উপজেলার বিভিন্ন সংরক্ষিত বনাঞ্চলে দেখা গেছে এক ভয়াবহ দৃশ্য। কুমীরমারা খালের পাশে সহস্রাধিক গাছ কেটে নির্মাণ করা হয়েছে ১৫ ফুট প্রশস্ত কাঁচা রাস্তা। বনবিভাগের অনুমতি ছাড়াই ‘ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প’ নামে এই রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে, যা বাস্তবায়নের পেছনে রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের যোগসাজশ।

অবৈধ করাতকল, ঘের ও বসতি
২০১২ সালের করাতকল লাইসেন্স বিধিমালা অনুযায়ী, সংরক্ষিত বনভূমি থেকে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকল স্থাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অথচ বরগুনা জেলাতেই আছে অন্তত ২৫টি করাতকল, যেগুলো সংরক্ষিত বনভূমির ৩০০ গজের মধ্যে অবস্থিত। এসব করাতকল থেকে নিয়মিত মাসোহারা নিচ্ছেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। শুধু বরগুনা-পটুয়াখালী মিলিয়ে এসব অবৈধ করাতকলের সংখ্যা অর্ধশতাধিক।

বনের ভেতরে মাটি কেটে তৈরি করা হচ্ছে মাছের ঘের, কৃষি প্রকল্প ও গবাদিপশুর খামার। টিনের ঘর তুলে বসতি গড়ে তোলা হচ্ছে গহীন বনের ভেতরে। নিশানবাড়িয়া বনভূমিতে দেখা গেছে শতাধিক বসতবাড়ি, পুকুর, ও পশুর খামার। কোথাও কোথাও বনের জমি দখল করে তৈরি হয়েছে ডাকবাংলো, যাতায়াতের জন্য কাঁচা রাস্তা, আর সে রাস্তা হয়ে উঠেছে মাদক কারবারিদের নিরাপদ পথ।

বরগুনা বন বিভাগের "সুফল প্রকল্প" (SUFAL Project) মূলত বাংলাদেশের বন অধিদপ্তরের একটি বৃহৎ বনায়ন ও জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন প্রকল্প, যা পরিবেশ রক্ষা ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে। এটি একটি সরকারি ও আন্তর্জাতিকভাবে অর্থায়িত প্রকল্প, যার অর্থায়নে রয়েছে বিশ্বব্যাংক (World Bank) ও বাংলাদেশ সরকার।

বরগুনা, উপকূলীয় এলাকা হিসেবে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিতে রয়েছে। এ অঞ্চলে "সুফল প্রকল্প" চালুর মূল উদ্দেশ্য ছিল: উপকূলীয় এলাকার বনাঞ্চল সংরক্ষণ ও পুনঃবনায়ন,স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততায় সামাজিক বনায়ন গড়ে তোলা,জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা,জলবায়ু সহনশীল কৃষি ও বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করা

‘সুফল প্রকল্প’ নামে বন সংরক্ষণের একটি বড় প্রকল্পের কথাও উঠে এসেছে অনিয়মের তালিকায়। প্রকল্পের প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বাদ দিয়ে উৎকোচের বিনিময়ে সুবিধাভোগী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বনবিভাগের পছন্দের লোকদের। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের কোটি টাকার বরাদ্দ থেকে টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নিচ্ছেন বিট অফিসার, রেঞ্জার, ও ডিএফও (বিভাগীয় বন কর্মকর্তা)।

খুটা জালে মাছ নয়, ধরা পড়ে ভবিষ্যৎ
বরগুনার পাথরঘাটার লালদিয়ার চরে বঙ্গোপসাগরের জলমহালে মাইলের পর মাইল বন কেটে পুঁতে দেওয়া হচ্ছে খুটা। এতে শুধু বন হারাচ্ছে না, প্রতিদিন অকারণে মারা যাচ্ছে শত শত প্রজাতির মাছের রেনু (পোনা) , “খুটা জাল” বা “স্টেক নেট” হলো এমন একধরনের জাল যা নদী, খাল বা মোহনায় বাঁশের খুঁটি পুঁতে স্থায়ীভাবে বসানো হয়। জোয়ার-ভাটার উপর নির্ভর করে এই জালে বিভিন্ন আকারের মাছ আটকে পড়ে। এটি একবার বসালে দিনের পর দিন স্থায়ীভাবে একই স্থানে থেকে যায়।

সমস্যা ও ক্ষতিকর দিকসমূহ: অবৈধ ও পরিবেশবিরোধী জাল খুটা জাল সাধারণত জাটকা রক্ষা বা মাছের প্রজনন মৌসুমে নিষিদ্ধ হলেও কিছু প্রভাবশালী মহল বছরের পর বছর ধরে এই জাল বসিয়ে রাখে। এর ফলে ছোট মাছ, রেণু মাছ, এমনকি ডিমওয়ালা মা মাছও ধরা পড়ে যা সামগ্রিকভাবে মাছের প্রজনন ক্ষমতা ধ্বংস করে দেয়।

জীববৈচিত্র্য হুমকিতে: বনের নদী বা মোহনায় খুটা জাল বসালে ডলফিন, কচ্ছপের মতো জলজ প্রাণীর চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রাণী জালে আটকে গিয়ে মারা যায়।

 স্থানীয় জেলেদের জীবিকায় মারাত্মক প্রভাব: খুটা জাল নদীর বড় অংশ দখল করে রাখে, যার ফলে সাধারণ ও গরিব জেলেরা খালি জাল নিয়ে নদীতে গিয়ে কোনো মাছ পায় না। এতে করে সমাজে বৈষম্য বাড়ছে এবং জীবিকার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।

নদী দখলের মাধ্যম: খুটা জালের আড়ালে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী নদীর অংশবিশেষ প্রায় ‘নিজস্ব সম্পত্তি’তে রূপান্তর করে ফেলেছে।দিনের পর দিন নদীজুড়ে এসব বাঁশের খুঁটি থেকে জাল ঝুলে থেকে অন্য জেলেদের বাধা সৃষ্টি করে।

 আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই:মৎস্য আইনে খুটা জাল নিয়ন্ত্রিত বা নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে প্রশাসনিক নজরদারি খুবই দুর্বল। অভিযানের নামে মাঝে মাঝে লোক দেখানো জাল কাটা হলেও, কয়েকদিন পর আবার সেই জায়গাতেই নতুন খুঁটি ও জাল বসে যায়।

ধরিত্রি রক্ষায় আমরা (ধরা)'র সাথে সম্পৃক্ত পরিবেশকর্মী আরিফুর রহমান বলেন, বরগুনার পাথরঘাটায় লালদিয়ার চরে বঙ্গোপসাগরের বিস্তির্ণ জলমোহনায় মাইলের পর মাইল এলাকা জুড়ে বন বিভাগের গাছ কেটে খুটা পুতে জাল দিয়ে চলছে মাছ ধরার বাণিজ্য। এতে একদিকে যেমন মাছের প্রজাতি বিলুপ্ত হচ্ছে তেমনি উজাড় হচ্ছে বনভূমি। খুটা জালে প্রতিদিন শত শত প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণির এক থেকে দুই টন রেনু বা পোনার মৃত্যু হয় অকারণেই। তিনি আরও বলেন, এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে বনবিভাগের লোকজনের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে।      

সুন্দরবন সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ টিআইবি’র সহযোগী সংগঠন সচেতন নাগরিক কমিটির বরগুনা জেলার সভাপতি মনির হোসেন কামাল বলেন, , ওই সময় সর্বস্তরের সচেতন মহল এবং পরিবেশ কর্মীরা বন কেটে যাতে বনের গভীরে সড়ক নির্মাণ না করা হয় সে জন্য প্রতিবাদ করেছিলাম। 

কিন্তু কোন কাজ হয়নি। তাছাড়া এই সড়ক দিয়ে সাধারণ গ্রামবাসী ও তাদের গবাদিপশু বনের ভেতরে অবাধে চলাচল করানোয় সংরক্ষিত এ বনাঞ্চল এখন চরম হুমকির মুখে। সেসময় বন বিভাগের পক্ষ থেকেও কোন অপত্তি জানানো হয়নি। তিনি আরও বলেন, সড়কটি এমনিতেও সাগরের জলোচ্ছাসে দ্রুতই ভেঙ্গে যাবে। মাঝখান থেকে সহস্রাধিক গাছ কাটা পড়লো যা কিছুতেই ঠিক হয়নি। 

তিনি আরও বলেন, বন বিভাগের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বনের জমি দখল, অবৈধ করাতকল, গাছ কাটা, ক্ষতিকর খুটা জালের বাণিজ্য দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। এসব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ পরিবেশন হলেও পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি।        

এসব অনিয়মের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. সফিকুল ইসলাম, সহকারী বন সংরক্ষক এবং বরগুনা অঞ্চলের রেঞ্জার আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে। রেঞ্জার আখতারুজ্জামান যোগদানের পর থেকেই বরগুনা অঞ্চলে বেড়েছে বন উজাড়, করাতকলের সংখ্যা, ও মাসোহারা প্রথা। এমনকি দরিদ্র জেলেদের কাছ থেকেও অবৈধভাবে টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

এ বিষয়ে বরগুনা-পটুয়াখালী অঞ্চলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. সফিকুল ইসলামের সাথে কথা বলতে মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।    

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বিশেষ করে বরগুনা ও পটুয়াখালীর মত এলাকা ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর লবণাক্ততার আশঙ্কায় ভরা সেখানে বন কেবল প্রকৃতি নয়, জীবন রক্ষাকারী ঢাল। এই বনের শিকড় ধরে টিকে আছে স্থানীয় মানুষের ঘরবাড়ি, কৃষি, পশুপালন এবং মাছ ধরার জীবনচক্র।

উপকূলীয় বনাঞ্চলে থাকা গর্জন, সুন্দরী, কেওড়া, বাঁশ ও নানা প্রজাতির বৃক্ষ শুধু প্রাকৃতিক প্রতিরোধই নয়, হাজারো পাখি, কীটপতঙ্গ, সরীসৃপ, বন্যপ্রাণী ও জলজ প্রাণীর জন্য এক অপরিহার্য আবাসস্থল। এসব গাছ মাটির ক্ষয় রোধ করে, নদীর পাড় বাঁচিয়ে রাখে, এমনকি সাইক্লোনে মানুষের জীবন রক্ষায় প্রাকৃতিক বাধা হিসেবে কাজ করে।

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) এবং IPCC এর গবেষণায় বলা হয়েছে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন ধ্বংসের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে দ্রুত, হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। পৃথিবীতে নিঃসরণ হওয়া গ্রিনহাউজ গ্যাসের প্রায় ১১ শতাংশ আসে শুধু বন উজাড় থেকে।

বন ধ্বংস হলে শুধু পাখির ডানাই ভাঙে না, মানুষের ভবিষ্যৎও অন্ধকারে ডুবে যায়। এই সবুজের মৃত্যু মানে শস্যহীন মাঠ, জলে ডোবা জনপদ, ঝড়ের ভয়, রোগের বিস্তার আর অর্থনৈতিক সংকটের ভয়াবহতা।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status