অবৈধ ভিওআইপি কারনে বৈদেশিক মুদ্রা ও রাজস্ব বিপর্যয়
এটা স্বতঃসিদ্ধ যে, আন্তর্জাতিক কল ব্যবসায় অবৈধ ভিওআইপির উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। প্রযুক্তির নতুন নতুন উদ্ভাবন ও প্রয়োগে এর প্রসার ব্যপকতা অর্জন করেছে। দেশে ৩জি/৪জি চালুু হওয়ার ফলে গ্রামে গঞ্জেও এখন মোবাইলের ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ায় এর মাধ্যমে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবৈধ ভিওআইপির ব্যবসা এখন রমরমা। বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন সময়ে বিটিআরসি কর্তৃক ৩জি/৪জি ব্রডব্যান্ড এর গতি শিথিল করার সময়ে এর সরব অস্তিত্বের বিষয়টি প্রত্যক্ষভাবে লক্ষ্য করা যায়।
গত জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে ২৯ ডিসেম্বর ২০১৮ হতে পরবর্তী ৩ দিন হাইস্পিড মোবাইল ব্রডব্যান্ড (৩জি/৪জি) এর গতি শিথিল করা হয়েছিল। এর ফলে অবৈধ ভিওআইপিকারীরা ইন্টারনেট ব্যবহারে অপারগ হয় যার পরিপ্রেক্ষিতে দেশে আন্তঃগামী কল গড়ে প্রায় ১০০ ভাগ বৃদ্ধি পায়।
নিন্মে উদ্বৃত টেবিল হতে বিষয়টি স্পষ্ট
অবৈধ ভিওআইপি কারনে বৈদেশিক মুদ্রা ও রাজস্ব বিপর্যয়
উপরোক্ত পরিসংখ্যান হতে দেখা যাচ্ছে যে, ইন্টারনেটের গতি হ্রাসের ফলে পূর্বের সপ্তাহের তুলনায় ঐ তিনদিন আন্তঃগামী কলের পরিমান প্রায় ১০০ ভাগ অর্থাৎ দ্বিগুন বৃদ্ধি পায়। এই শতভাগ বৃদ্ধির কিয়দাংশ গ্রাহকগন মোবাইল অ্যাপস্ এর মাধ্যমে ভয়েস সার্ভিস/কল ব্যবহারে অপারগতার কারনে হয়েছে, অবশিষ্ট সিংহভাগই বৃদ্ধি কেবলমাত্র অবৈধ ভিওআইপির অনুপস্থিতির কারনে সম্ভব হয়েছে যা কিনা সহজলভ্য ৩জি/৪জি মোবাইল ব্রডব্যান্ড এর উপর নির্ভরশীল। এতে প্রতীয়মান হয় যে, দেশে অবৈধ ভিওআইপির উপস্থিতি প্রকট। ফলে সরকার একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে অপরদিকে বিপুল পরিমানে রাজস্বও হারাচ্ছে।
সম্প্রতি বিটিআরসি ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক পরিচালিত কয়েকটি অভিযানে উপরোক্ত বিষয় সমুহের প্রমান মিলেছে। বিটিআরসির উদ্যোগে পরিচালিত অপারেশনে ঢাকা এবং চট্টগ্রামে কয়েকটি অঞ্চল হতে উদ্ধারকৃত সরঞ্জাম হতে এ তথ্য স্পষ্ট যে, শহরের/গ্রামের আনাচে কানাচে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা শনৈ শনৈ বিস্তৃত হচ্ছে।
নিকট অতীতে অবৈধ ভিওআইপির বিরুদ্ধে বিটিআরসি কর্তৃক পরিচালিত দুটি অভিযান হতে আরো একটি গুরুত্বপূর্ন তথ্য উদঘাটিত হয়েছে যে, এ সকল অবৈধ কর্মকান্ডে দেশের মোবাইল অপারেটরদের সিম ব্যপক ভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
২০১৮ সনের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে পরিচালিত এই সকল অভিযানে মোবাইল অপারেটরদের যেসংখ্যক সিম উদ্ধার ও জব্দ করা হয়েছে তার পরিখংখ্যান নিন্মে দেওয়া হল।
অবৈধ ভিওআইপি কারনে বৈদেশিক মুদ্রা ও রাজস্ব বিপর্যয়
উপরোক্ত তথ্য হতে এটি স্পষ্ট যে, অবৈধ ভিওআইপি কর্মকান্ডে ব্যবহৃত সরঞ্জামের মধ্যে দেশের মোবাইল অপারেটরদের সিম ব্যবহার অন্যতম। কাজেই অবৈধ ভিওআইপির মতো ঘৃন্য কাজের দায়-দায়িত্ব হতে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে অব্যাহতি দেয়া যায় না। বিটিআরসি পরিচালিত অভিযান শেষে প্রেস কনফারেন্সে বিটিআরসির চেয়ারম্যান উল্লেখ করেন যে, সিম বিক্রির পর কোথায় তা ব্যবহৃত হচ্ছে সেটি লক্ষ্য রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে মোবাইল অপারেটরদের। তিনি হুঁশিয়ার করেছেন এই বলে যে, এ জন্য মোবাইল অপারেটরদের বিটিআরসির নিকট জবাবদিহী করতে হবে। বিটিআরসির ডাইরেক্টর জেনারেল, ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড অপারেশন্স প্রেস কনফারেন্সে উল্লেখ করেছেন যে, এ সকল ব্যর্থতার জন্য অপারেটরগনকে টেলিকম আইন ও অর্থপাচার আইনের সম্মুখীন হতে হবে। দুঃখের বিষয় হচ্ছে বাস্তবক্ষেত্রে অপরাধকারীগনের বিরুদ্ধে তেমন কোন কঠোর শাস্তি লক্ষ্যনীয় নয়। পক্ষান্তরে, মোবাইল অপারেটরগন অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে। সম্প্রতি সরকার কর্তৃক ঘোষিত অভ্যন্তরীন মোবাইল কল রেট সর্বনিম্ন প্রতি মিনিট ৪৫ পয়সা করা হয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আন্তঃগামী কল রেটের যে হিস্যা মোবাইল অপারেটরগন পান তার মূল্য প্রতি মিনিট প্রায় ৩৩ পয়সা। কাজেই আন্তর্জাতিক আন্তঃগামী কলের চেয়ে অভ্যন্তরীন কলের আড়ালে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসায় সংশ্লিষ্ট পক্ষ উৎসাহিত হবে তা সহজেই অনুমেয়। এতে দেশের অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা বেগবান হচ্ছে।
বিটিআরসি পরিচালিত কেবল মাত্র দুটি অভিযান হতে এটি স্পষ্ট যে, অবৈধ ভিওআইপির কারনে সরকার বিপুল পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা ও রাজস্ব হারাচ্ছে। ওই দুটি অভিযান হতে মোবাইল অপারেটরদের প্রায় ৫৩,০০০ সিম জব্দ করা হয়েছে। একটি রক্ষণশীল হিসাব হতে এই উপসংহারে উপনীত হওয়া যায় যে, যদি দৈনিক মাত্র ১ লক্ষ সিম কার্ড অপরাধীরা ব্যবহার করে তা থেকে অপরাধকারীরা আনুমানিক বৎসরে প্রায় ৬-৭ হাজার কোটি টাকা লোপাট করছে। অন্যদিকে এ থেকে সরকার বার্ষিক ২৫০০ কোটি টাকা প্রাপ্তি থেকে বি ত হচ্ছে।
বিটিআরসি ও আইনশৃংখলা বাহিনী কর্তৃক পরিচালিত অভিযানে আরো একটি গুরুত্বপূর্ন তথ্য উদঘাটিত হয় যে, অবৈধ ভিওআইপিতে তথ্য প্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহৃত হচ্ছে। এই সকল সরঞ্জাম বিক্রয়ের প্রাক্কালে বিক্রিত সরঞ্জামটি কোথায় ব্যবহৃত হচ্ছে তার দায় দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট পক্ষকে নিতে হবে। এই বিষয়ে একটি নীতিমালা থাকা জরুরী মর্মে প্রতীয়মান হয়।
এ বিষয়টি এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, দেশের আন্তর্জাতিক কল ব্যবসায় অবৈধ ভিওআইপি প্রকটভাবে উপস্থিত এবং দিনে দিনে এর বিস্তৃতি সম্প্রসারিত হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে দেশ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা ও রাজস্ব হারাচ্ছে এবং এ ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষের ব্যবসা দারুনভাবে সংকুচিত হচ্ছে এবং এতে এই ইন্ডাস্ট্রির সহশ্রাধিক কর্মচারীর ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কাজেই এ অশুভ শক্তিকে কঠোর হস্তে দমনের জন্য রাষ্ট্রকে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। প্রয়োজনে অপরাধীদেরকে সম্প্রতি প্রনয়নকৃত ডিজিটাল আইন ও অন্যান্য নিরাপত্তা আইনের আওতায় কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।