ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
মঙ্গলবার ১৬ জুন ২০২৬ ১ আষাঢ় ১৪৩৩
এমভি আবদুল্লাহর জিম্মি দশার সেই দিনগুলো
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Wednesday, 17 April, 2024, 9:12 AM

এমভি আবদুল্লাহর জিম্মি দশার সেই দিনগুলো

এমভি আবদুল্লাহর জিম্মি দশার সেই দিনগুলো

“সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি হল যখন নৌবাহিনীর জাহাজ আসল। অনেকক্ষণ পরে। প্রায় ১০-১২ ঘণ্টা পরে। নৌবাহিনীর জাহাজ আসল। একটা এয়ারক্রাফট আসল। তখন পরিস্থিতি চেইঞ্জ হঠাৎ করে। পাইরেটসরা খুব ছটফট শুরু করল।

জিম্মি করার পর ওই সময়েই সবচেয়ে বেশি কড়াকড়ি আরোপ করে জলদস্যুরা। একই জায়গায় গাদাগাদি করে থাকা বন্দি নাবিকরা তখনই প্রথম গুলির শব্দ শোনেন যা ভীতির মাত্রাও বাড়িয়ে দেয়। এমভি আবদুল্লাহর কাছে আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর জাহাজ দেখার পর জলদস্যুদের আচরণে চট করেই পরিবর্তন দেখতে পান নাবিকরা। 

“আমাদের খুব রেসট্রিক্টেড করে রাখা হয়। ওয়াশরুমেও যেতে পারছি না বা শুয়ে থাকো, দাঁড়ানো যাবে না, বসে থাকো। নড়াচড়া করবে না। অস্ত্র তাক করে রাখছে আমাদের দিকে। 

”আবার নৌবাহিনীর জাহাজও বলতেছে, ‘তোমরা থাম। না থামলে আমরা এখনই চার্জ করব। জোর করে তোমাদেরকে থামাব…’। তখন আরেকটা ভীতিকর পরিস্থিতি। এরাও মানতেছে না, ওরাও মানতেছে না। মাঝখানে পড়ে আমরা বলির পাঁঠা।

ভারত মহাসাগরে অস্ত্রের মুখে সোমালি জলদস্যুদের কবলে এমভি আবদুল্লাহ জিম্মি হওয়ার পর তখনও সেটি সোমালি উপকূলে প্রবেশ করেনি। এর আগেই আন্তর্জাতিক নোবাহিনীর একটি জাহাজ বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজটির সহায়তায় এগিয়ে এলে এমন ভীতিকর অবস্থা তৈরি হয়। সেসময় হঠাৎ করে গোলাগুলির পরিস্থিতিও তৈরি হয়। 

জিম্মি অবস্থা থেকে মুক্ত হওয়ার ৩৩ দিন পর সেই বন্দি দশার দিনগুলোর কথা বলছিলেন এমভি আবদুল্লাহর চিফ অফিসার আতিকউল্লাহ খান। 

আতঙ্ক, ভীতি আর অজানা দিনগুলোর সেই পরিস্থিতি আর অভিজ্ঞতা কেমন ছিল, এক অডিও বার্তায় সেই বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। 

অস্ত্রধারী ১২ জন সোমালি জলদস্যুদের হাতে হঠাৎ কয়লাবাহী জাহাজটির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বন্দি হয়ে পড়ার পর তারা চুপসে যান। মুহূর্তেই পাল্টে যাওয়া পরিস্থিতিতে কী হতে যাচেছ সেই ভাবনা যেমন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, তেমনি নিজেদের পাশাপাশি পরিবারের কথাও ভাবনায় আসে প্রবলভাবে। 

জাহাজের স্বস্তিকর আবাসের বদলে হুট করেই একটা জায়গায় গাদাগাদি করে সবাইকে রাখার বিষয়টি আসে নাবিকদের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে আতিকউল্লাহ বলেন, “ব্রিজে ছিলাম আমরা সবাই। ব্রিজেই থাকতেছি। হঠাৎ করে একটা অন্যরকম পরিস্থিতি আর কি। 

”জাহাজে আমাদের সবার জন্য আলাদা কেবিন, আলাদা ওয়াশরুম। যেমন আমরা যারা সিনিয়ররা আছি তাদের দুইটা রুম। একটা লিভিং রুম, আবার বেডরুম। মোটামুটি ভাল পরিবেশে আমরা থাকার চেষ্টা করি। হঠাৎ করে আমরা একসাথে ২৩ জন লোক গাদাগাদি করা, ব্রিজের মধ্যে। যেখান থেকে আমরা চালাই (জাহাজ)।

জাহাজের ব্রিজে থাকা একটা বাথরুমই ২৩ নাবিক ও ১২ জলদস্যু ব্যবহার করছিলেন বলে জানান তিনি। 

এক মাসের বেশি সময় অস্ত্রধারী সোমালি জলদুস্যুদের সঙ্গে জিম্মি অবস্থায় যাপিত জীবনের অনেক ঘটনাই উঠে আসে জাহাজটির চিফ অফিসারের কথায়। 

সোমালিয়ার জলদস্যুদের বিভিন্ন লোমহর্ষক গল্প কমবেশি সবারই জানা ছিল এমভি আবদুল্লাহর নাবিকদের; তবে তারাও যে একদিন দুর্ধর্ষ সেই দুস্যদের কবলে পড়বেন, অস্ত্রের মুখে অনিশ্চয়তা আর মৃত্যুর ভয় নিয়ে দিনের পর দিন কাটাবেন, তা হয়ত কল্পনাও করেননি কখনও তারা। 

৩৩ দিনের জিম্মি দশার পর শনিবার এমভি আবদুল্লাহর সেই নাবিকদের মাথার ওপর থেকে অস্ত্র সরেছে। ভয়ঙ্কর এক পরিস্থিতি থেকে তারা যে পরিত্রাণ পেয়েছে, সেটিও যেন স্বপ্নের মত। দুস্যরা তাদের ছেড়ে গেলেও এখনও আঁতকে উঠছেন তাদের কেউ কেউ। স্মৃতিতে তাড়া করছে সোমালিয়া উপকূলে দস্যুদের সঙ্গে কাটানো দিনগুলো। 

মোজাম্বিক থেকে কয়লা নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত যাবার পথে গত ১২ মার্চ সোমালিয়া উপকূল থেকে ৬০০ নটিক্যাল মাইল দূরে জলদস্যুদের কবলে পড়ে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ এমভি আবদুল্লাহ। অস্ত্রের মুখে জিম্মি করা হয় ২৩ নাবিককে, যাদের সবাই বাংলাদেশি। 

জিম্মি হওয়ার খবর ছড়াতেই দেশে নাবিকদের স্বজনরা ভেঙে পড়েন। টেলিভিশন আর পত্রিকার পাতায় নজর ছিল গোটা দেশের। অপেক্ষা ছিল কবে মুক্তির খবর মিলবে। অবশেষে ১৩ এপ্রিল বাংলাদেশ সময় রাত ৩টার দিকে এমভি আবদুল্লাহ থেকে নেমে যায় ৬৫ জলদস্যু। এরপর জাহাজটি রওনা হয় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের পথে। 

মুক্ত সাগরে জাহাজ ভাসতে শুরু করার দিন দুয়েক পর চিফ অফিসার আতিকের অডিও বার্তায় উঠে এসেছে দুর্বিষহ ও ভয়ঙ্কর সেই সময়ের চিত্র। 

প্রস্তুত হওয়ার সুযোগও পাইনি
ভারত মহাসাগরের যে অংশ দস্যু আক্রমণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ধরা হয়, তার অনেকটা বাইরে দিয়েই ছুটছিল এমভি আবদুল্লাহ। কিন্তু এরপরও দস্যুদের আক্রমণের মুখে পড়তে হবে, যা চিন্তাও করেননি নাবিকরা। 

ফলে হঠাৎ করে দস্যুরা জাহাজের কাছে চলে আসলে সবাই মানসিকভাবে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে বলে জানান চিফ অফিসার আতিকউল্লাহ। 

শুরুর ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, “আমি জাস্ট ৮টার সময় ডিউটি অফ করে একটু রেস্ট করছিলাম। দ্বিতীয় রোজা ছিল ওইদিন। হঠাৎ করে একটা ওয়ার্নিং দিল ইয়েতে, একটা এনাউন্সমেন্ট। তারপর আমরা বিভিন্ন অ্যাক্টিভিটি করলাম। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই পাইরেটসরা (জলদস্যু) চলে আসল। হঠাৎ করেই হয়ে গেল আরকি, এরকম একটা অবস্থা। মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার সুযোগটা পাইনি আমরা।

এমভি আবদুল্লাহর জিম্মি দশার সেই দিনগুলো
“পাইরেটসরা প্রথমেই একটা ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এটার জন্য আমরা বেশি ভয় পাচ্ছিলাম। কারণ আমরা জানতাম যে, সোমালিয়ান পাইরেটসরা সাধারণত সি-ম্যানদের তেমন ক্ষতি করে না। স্পেশাল কোনো কারণ ছাড়া। কিন্তু শুরুতে তারা একটু ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। তো কীভাবে প্রথম ফেইস করব, এটা নিয়ে সবাই অনেক ভয়ের মধ্যে ছিলাম। 

“কারণ আমরা শুনেছি, শুরুতে তারা উঠে গোলাগুলি করে। কাউকে মারধর করে। একটা ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য। পরবর্তীতে যাতে আমরা ভয়ের মধ্যে থাকি সবসময়। চিল্লাপাল্লা করতেছিল তারা। বাট আমরা তো খুব একটা বুঝতেছিলাম না। সবাই ভয়ের মধ্যে ছিলাম। আল্লাহ আল্লাহ করতেছিলাম। 

জাহাজটি মূলত ছিনতাই করে ১২ দস্যু। তাদের কেউই ইংরেজি বলতে না পারায় নাবিকরা তাদের কথা কিছুই বুঝতে পারছিল না বলে জানান আতিকউল্লাহ। 

তার ভাষ্য, “মূল পাইরেটস ১২ জন জাহাজটাকে হাইজ্যাক করছে। পরবর্তীতে ৬৫ জনের মত পাইরেটস ছিল। যেদিন লাস্ট নামতেছিল। এগুলো পরে ধাপে ধাপে আসছিল। সোমালিয়া আসার পরে। কিন্তু সাগরে ১২ জনই আমাদের অ্যাটাক করেছিল।

আক্রান্ত হয়ে জাহাজের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর সবার আগে পরিবারের কথাই মনে পড়েছিল নাবিকদের। 

আতিকউল্লাহ বলেন, “আমাদের সবার মধ্যে ভয় ছিল পরিবারকে কীভাবে জানাব। এটা কীভাবে ফেইস করব। কারণ কারো পরিবারই এই পরিস্থিতি মেনে নিবে না। আর আমরা কি নিজেকে সান্ত্বনা দিব, নাকি পরিবারকে।

“আমি ঠিক করি পরিবারকে জানাব না। পরিবারকে মেসেজ দিই যে আমাদের শিপের ওয়াইফাই নষ্ট হয়ে গেছে। দুই তিনমাস হয়ত কথা বলতে পারব না। যাতে করে তারা টেনশন না করে। পরে তারা আস্তে ধীরে জানতে পারলে যা হবার তা হবে।

মেরে ফেলার হুমকি
এমভি আবদুল্লাহর দখল নেওয়ার পর জলদস্যুরা নাবিকদের সবাইকে জাহাজের ব্রিজে নিয়ে যায়। 

পরিস্থিতি বর্ণনা করে চিফ অফিসার বলেন, “এরপর মোবাইল নিয়ে নিচ্ছিল। তখন আমরা সবাই খুব হতাশ হয়ে পড়লাম। এখন তো যোগাযোগ শেষ। আর কথা বলতে পারব না পরিবারের সাথে। মনে হচ্ছিল এটাই পরিবারের সাথে শেষ কথা।

“ব্রিজে ছিলাম আমরা সবাই। ব্রিজেই থাকতেছি। হঠাৎ করে একটা অন্যরকম পরিস্থিতি আর কি। জাহাজে আমাদের সবার জন্য আলাদা কেবিন, আলাদা ওয়াশরুম। যেমন আমরা যারা সিনিয়ররা আছি তাদের দুইটা রুম। একটা লিভিং রুম, আবার বেডরুম। মোটামুটি ভাল পরিবেশে আমরা থাকার চেষ্টা করি। হঠাৎ করে আমরা একসাথে ২৩ জন লোক গাদাগাদি করা, ব্রিজের মধ্যে। যেখান থেকে আমরা চালাই (জাহাজ)।

জাহাজের ব্রিজে থাকা একটা ওয়াশরুমই ২৩ নাবিক ও ১২ জলদস্যু ব্যবহার করছিলেন বলে জানান তিনি। 

ভাষা বুঝতে না পারার জটিলতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “শুরুতে ওদের কথাও আমরা বুঝতে পারছিলাম না। কারণ ওরা ইংরেজিতে একদম কাঁচা। আমরা তো নরমালি জাহাজ চালাই। আমাদের কথা মত জাহাজ চলে। এখন ওরা আমাদের চালাচ্ছে। ওদের কথা মত জাহাজ চালাতে হচ্ছে। কিন্তু ওদের কথা আমরা বুঝতে পারছিলাম না। এটাও একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। তারপরও সবাই চেষ্টা করছিলাম মানিয়ে নিতে। 

সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি হিসেবে তাদের সহায়তায় আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর জাহাজ এগিয়ে আসার সময়কে তুলে ধরেন চিফ অফিসার। 

তিনি বলেন, “অনেকক্ষণ পরে। প্রায় ১০-১২ ঘণ্টা পরে। নৌবাহিনীর জাহাজ আসল। একটা এয়ারক্রাফট আসল। তখন পরিস্থিতি চেইঞ্জ হঠাৎ করে। পাইরেটসরা খুব ছটফট শুরু করল।

এমভি আবদুল্লাহর জিম্মি দশার সেই দিনগুলো
সেসময় হঠাৎ করে গোলাগুলির পরিস্থিতি তৈরি হয় জানিয়ে তিনি বলেন, “নৌবাহিনীর জাহাজ ওয়ার্নিং দেওয়া শুরু করল, কাউন্টিং শুরু করল যে না থামলে আমরা এখন ফায়ার শুরু করব। দেখি যে হঠাৎ করে ওরা ফায়ার শুরু করল, বাট আমরা দেখতে পারছি না কোথায় ফায়ার করছে। আসলে ফাঁকা ফায়ার করছিল তখন। পাইরেটসরাও টানটান, ওরা মোকাবেলা করবে। ওরা মোকাবেলা মানে আমাদের জিম্মি করে রাখবে এটাই আরকি। আমাদের দিকে অস্ত্র ধরে রাখছে। 

“জলদস্যুরা একপর্যায়ে এমভি আবদুল্লাহর ক্যাপ্টেনকে দিয়ে নৌবাহিনীকে বার্তা দিল যে, তারা সরে না গেলে নাবিকদের মেরে ফেলা হবে। এরপর ওরা (জলদস্যুরা) ক্যাপ্টেনকে দিয়ে ভিএইচএপে ওদেরকে বলাল যে, তোমরা চলে যাও, নাইলে আমাদের মেরে ফেলবে। তখন একটু কান্নাকাটি অবস্থা।

চিফ অফিসার বলেন, “তারপর নৌবাহিনী কিছুক্ষণ পর থামছে। এরপরও ওরা আমাদের সাথে সাথেই যাচ্ছিল খুব কাছ দিয়ে। এটাও পাইরেটসরা খুব ইয়ে…। তখন আমাদেরকে তারা রেস্ট্রিক্টেড করে রাখল। আমরা ব্রিজে ঘুমাইলাম।

জলদস্যুর হাতে জিম্মি জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর চিফ অফিসার আতিক উল্লাহ খান জাহাজে কাজ করছেন দেড় দশকের বেশি সময় ধরে।

এদিকে অস্ত্র, ওদিকেও অস্ত্র
জিম্মি হওয়ার পর জলদস্যুদের বিধি নিষেধ মেনেই নিজেদের জাহাজে চলাচল করতে হচ্ছিল নাবিকদের। তাই আস্তে আস্তে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে তারা খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা শুরু করেন। 

আতিকউল্লাহ বলেন, “এরকম পরিস্থিতিতে ‍ঘুম তো হওয়ার কথা না। একে এমন পরিস্থিতি, আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ঘুমানোর অভ্যাস ছিল না। এদিকে ফিরলেও অস্ত্র। ওদিকে ফিরলেও অস্ত্রসহ পাহারা। 

“বুঝলাম যে না, এখন আমরা তো জিম্মি। পরিস্থিতির সাথে কীভাবে মানিয়ে নিব। ওরকম প্রিপারেশন নিচ্ছিলাম সবাই। আস্তে আস্তে সবাই ইউজ টু হতে লাগলাম। ব্রিজে থাকা, অস্ত্রশস্ত্রের সাথে ঘুমানো।

প্রতিকূল পরিবেশেও নাবিকরা আশা হারাননি জানিয়ে আতিকউল্লাহ বলেন, “যেহেতু আমাদের কোম্পানির একটা জাহাজ আগেও এরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিল এবং কোম্পানি চেষ্টা করেছিল ওটাকেও তাড়াতাড়ি নিয়ে আসার। সব মিলিয়ে তিন মাসের মাথায় তাদের নিয়ে আসছিল।

এমভি আবদুল্লাহর জিম্মি দশার সেই দিনগুলো
“তাই শুরু থেকে সবাই মোটামুটি এটা আশ্বস্ত ছিলাম, মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম যে দুই থেকে তিন মাস। এর আগে তিন মাস লেগেছে। এখনো হয়ত তিন মাস লাগতে পারে বা তার চেয়ে কমও লাগতে পারে। কারণ এখন তো কোম্পানির অভিজ্ঞতা হয়েছে। হয়ত তারা একটু আর্লিও করতে পারে।

তিনি বলেন, “সব মিলিয়ে দুই থেকে তিন মাসের মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সেভাবেই সবকিছু সেট করছিলাম। পানি কীভাবে ব্যবহার করব। যেটুকু আছে খাবার এটাকে দিয়ে কীভাবে দুই-তিন মাস চলবে। আমাদের কাছে মোটামুটি এক মাসের ছিল আরকি। 

“এখন তো আবার লোকসংখ্যা বেড়ে গেল। সোমালিয়ায় আসার পর আরো পাইরেটস যোগ দিল অনেক। একসাথে সবাই মিলে কম কম করে ব্যবহার করে, ওদের সাথে একটু পরামর্শ করে রেশনিং শুরু করলাম।


মুক্তির আশা ছিল ঈদের আগেই
আতিকউল্লাহ বলেন, “জাহাজে সাধারণত আমরা কাজের মধ্যেই থাকি। যেহেতু কাজে থাকি আমাদের সময়টা কেটে যায়। এসে পরিবারের সাথে কথা বলি। খাওয়া দাওয়া করি। আমাদের সময়টা কেটে যায়। আবার বিশ্রাম করি। নরমাল রুটিন এটাই আমাদের। কিন্তু এখন তো পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। কাজ নেই। কোনো ডেইলি রুটিন নেই। বসেই থাকা। 

“সময় তো কাটছিলই না। ঘুম হচ্ছিল না ঠিকমত। সব মিলিয়ে আস্তে আস্তে মানসিকভাবে সবার মাথার মধ্যে দুশ্চিন্তা ঢুকতেছিল। কত দিন এভাবে কাটবে, এটারও ঠিক নাই। অনিশ্চিত একটা পরিস্থিতি।

সোমালি জলদস্যুরা যাতে বিরক্ত কিংবা উত্তেজিত না হয়, সেজন্য তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেন জিম্মি নাবিকরা। 

আতিকউল্লাহর ভাষ্য, “শুরু থেকে পাইরেটদের সাথে ভালো ব্যবহার করতাম। কারণ জিম্মি হয়ে গেলে ভালো ব্যবহার করা ছাড়া কিছু করার নেই। হয়ত ভালো ব্যবহার করলে তারা আমাদের একটু সুযোগ সুবিধা দিবে। এটুকু এটলিস্ট আশা করতে পারেন। আর যদি তাদের সাথে ঘাড়ত্যাড়ামি করেন তারা আরও বেশি চাপ দেবে। 

“তো সবাইকে নির্দেশনা দেওয়া হল যেন সবাই ওদের সাথে ভালো ব্যবহার করে। তো দেখি একসময় তারা আশ্বস্ত হল। তখন দেখি তারা দিনের বেলা নামাজ, সেহেরি, ইফতারের জন্য নিচে যেতে দিত।

সেইসময় এক নাবিকের লুকানো মোবাইল ফোনে দেশের সংবাদ মাধ্যমে এমভি আবদুল্লাহর ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনার খবর দেখে আশাবাদী হয়ে উঠেন নাবিকরা। 

“এর মধ্যে হঠাৎ করে একজন নিচে গেল কোনো একটা উছিলা দিয়ে। তার কাছে একটা লুকানো মোবাইল ছিল। সেটাতে জাহাজের ওয়াইফাই দিয়ে একটু করে দেখল যে আমাদের ঘটনা অলরেডি সবাই দেশে জানে। মিডিয়াতে বলাবলি করছে। এসে আমাদের বলল। তখন আশ্বস্ত হলাম,” বলেন আতিক।

“যেহেতু আমাদের পরিবারের সাথে পুরো বাংলাদেশ কথা বলছে। এমনকি মন্ত্রণালয় থেকেও কথা বলছিল। তো আমরা আশ্বস্ত হলাম যে, আমাদের পরিবার অন্তত সারাদেশকে পাশে পেয়েছে।” 

দস্যুদের সঙ্গে সমঝোতার বিষয়টি কবে হবে, সেটা জানা ছিল না নাবিকদের। কিন্তু ঈদের আগেই মুক্তি মিলতে পারে, সেটি ভেবেই আশাবাদী ছিলেন তারা।

এমন ধারণার কারণ কী ছিল, সেই প্রশ্নে আতিকউল্লাহ বলেন, “আমরা জানতাম না। মাঝে মধ্যে শুনতাম যে, ঈদের আগে হয়ে যাবে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবর ছিল। অথবা পাইরেটসরা এটা জানত। এরা বলত যে, ঈদের আগে।

“আমরাও এভাবে আস্তে আস্তেহলেও হতে পারে। আল্লাহ যদি চায় আরকি। পরে দেখলাম ঈদের আগে হল না। সেটা নিয়েও আমরা আবার অনিশ্চিত। এখন তো ঈদের আগে হল না। তার মানে এটা একটা গুজব ছিল।

দস্যুদের অনুমতি নিয়ে নামাজ রোজাও করেছেন নাবিকরা। ঈদের নামাজ পরারও সুযোগ দিয়েছে দস্যুরা। 

আতিকউল্লাহ বলেন, “ওরা তো জানে ঈদ হচ্ছে মুসলমানের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। আর আমরা সবাই রোজা করতাম। নামাজ পড়তাম। তারা জানে আমাদের কালচার। এজন্য ওরা আমাদের পারমিশন দিল ঈদের নামাজ পড়ার।

“আমরা নামাজ পড়লাম। ওদের পারমিশন নিয়ে একটা ছবি তুললাম। ছবিটা মিডিয়ায় আসছিল। পরে যখন পাইরেটসরা জানল যে, এই ছবিটা মিডিয়াতে এসেছে তখন তারা এটা নিয়ে আমাদের চার্জ করেছিল। আমাদের উপর একটু কড়াকড়ি করছিল।

মুক্তির আগে জাহাজের পরিস্থিতি বর্ণনা করে চিফ অফিসার বলেন, “একদিন পরই দেখতেছি জাহাজের এনভায়রনমেন্ট চেঞ্জ হচ্ছিল। পাইরেটসদের মুভমেন্ট চেঞ্জ হয়ে গেল। তাদের মধ্যে দেখলাম যে, একটা বাড়ি যাওয়া বাড়ি যাওয়া ভাব আসতেছিল। সবার মধ্যে। তারা খুব উৎফুল্ল। 

“তখন আমাদের মনে হচ্ছিল, সামথিং ইজ গোয়িং টু হেপেন মেবি। মনে হচ্ছিল, তাদের মধ্যে কিছু একটা হয়েছে। বা কোনো একটা নেগোসিয়েশন। আমরা তখন খুব রেস্ট্রিক্টেড শেষ কয়েকদিন। খুব কনফিডেনশিয়ালভাবে হচ্ছিল। শুনলাম যে, আজকে পাইরেটসরা চলে যাবে।

এক মাস জিম্মি পরিস্থিতিতে থেকে মুক্তির আগে চাপা উত্তেজনা নির্ঘুম করে দিয়েছিল নাবিকদের। 

আতিকউল্লাহ বলেন, “আগে ‍ঘুম যাও হইত দুয়েক ঘণ্টা দিনের বেলা। রাতে তো ‍ঘুম হত না কারোরই। উত্তেজনায় সেটাও মোটামুটি ইয়ে হয়ে গেছে। কারণ উত্তেজনা, পাইরেটসরা চলে যাবে। তাদের চেঞ্জেস দেখে আমাদের মধ্যে খুব এক্সাইটমেন্ট কাজ করতেছিল। 

“পরে এভাবে আস্তে আস্তে সকাল থেকে যাবে যাবে করতে করতে আস্তে আস্তে রাত ১২টার দিকে তারা গেল আরকি। পাইরেটসরা যাবার সাথে সাথে আমাদের মাথা থেকে এক জাহাজ পরিমাণ যে বোঝা ছিল ওটা নেমে গেল হঠাৎ করেই। ১ মাসের একটা রুটিন ছিল একরকম। মেন্টালি প্রেশারাইজড ছিলাম। এখন আস্তে আস্তে

জাহাজে একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায়ের পর বুধবার ছবি তোলেন এমভি আবদুল্লাহ’র জিম্মি বাংলাদেশি ২৩ নাবিক। এ ছবি পরিবারের সদস্যদের কাছে পরে পাঠিয়েছেন তাদের কেউ কেউ।

এখনও দুঃস্বপ্ন তাড়া করে
জলদস্যুদের হাত থেকে মুক্তি পাবার পর ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অপারেশন আটলান্টার যুদ্ধ জাহাজের প্রহরায় গন্তব্যের দিকে চলছে এমভি আবদুল্লাহ। বাড়ানো হয়েছে অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাও। তবু আতঙ্ক পিছু ছাড়ছে না নাবিকদের। 

নাবিকদের মানসিক অবস্থার কথা জানিয়ে আতিকউল্লাহ বলেন, “আমরা এখনো হঠাৎ করে ঘুম উঠলে মনে হয় দুঃস্বপ্ন দেখছি। মনে হয় পাইরেটসরা এখনো আছে। তাড়াতাড়ি ব্রিজে যাই, দেখি যে ওরা আছে কিনা, ও নাই। রেস্ট্রিকশন তাদের ছিল যে, এর বাইরে যাওয়া যাবে না। গিয়েই দাঁড়াই যাই। 

“পাইরেটসরা তো আমাদের এর বাইরে যাওয়ার জন্য নিষেধ করত। এর বাইরে যেতে গেলে আমাদের মধ্যে ভয়টা এখনো কেটে ওঠেনি। হয়ত দুয়েক দিনের মধ্যে হয়ত ইনশাল্লাহ অ্যাডজাস্ট করে নিতে পারব। আস্তে আস্তে রিবিল্ট করার চেষ্টা করছি। জাহাজকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, সবকিছু মেনটেইন করার চেষ্টা করছি। সব মিলে আমরা রিলিফড। আলহামদুল্লিাহ। শুকরিয়া আল্লাহর কাছে। এত কম সময়ে হবে আমরা কেউ কল্পনা করিনি।

জিম্মি দশা থেকে মুক্তির জন্য সরকার, জাহাজের মালিক পক্ষ ও দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আতিকউল্লাহ বলেন, “এরকম একটা ব্যাপার যখন দেখলাম তখন অনেক ইমোশন কাজ করেছে আমাদের মধ্যে। দেশের মানুষ যে ভালোবাসা দেখিয়েছে। চিরজীবন আমরা কৃতজ্ঞ থাকব। এটা আমাদের সারাজীবনের প্রাপ্তি যে পুরো দেশের মানুষ আমাদের জন্য দোয়া করেছে।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status