ইউনূস সেন্টারের কার্যসূচিতে সামাজিক কার্যক্রমের প্রচারণা ও সামাজিক ব্যবসায় উদ্যোক্তাদের প্রেরণা জোগাতে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা করা অন্যতম। কিন্তু সম্প্রতি এ ধরনের কার্যক্রম থেকে সরে এসেছে ইউনূস সেন্টার। ড. ইউনূসের পক্ষে জনসংযোগের কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে কিছুদিন আগেও দেখা গেছে, ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে আসা নানা অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ বিবৃতি দেওয়াতে ইউনূস সেন্টার বেশ সরব ছিল। অথচ শ্রম আইন লঙ্ঘন মামলায় আদালত ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ব্যাপারে এখনো পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি ড. ইউনূসের জনসংযোগের দায়িত্ব পালন করা এই প্রতিষ্ঠান। বছরের প্রথম দিন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মামলায় ড. ইউনূস ও অপর চার বিবাদীকে ৬ মাসের কারাদণ্ড ও ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করে ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালত।
নতুন বছরের প্রথম দিনে সাজা হওয়া কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মামলার অভিযোগে বলা হয়, লাভের ৫ শতাংশ তার কর্মচারীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে শ্রম আইনে। কিন্তু গ্রামীণ টেলিকম আদৌ কর্মচারীদের মধ্যে তা ভাগ করে দেয়নি। গ্রামীণ টেলিকম বিষয়টি নিয়ে দুই শ্রমিক নেতাকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করে গ্রামীণ টেলিকম। তখন ওই দুই নেতাকে ৩ কোটি করে ৬ কোটি টাকা ঘুস দেওয়া হয়েছিল। ঘুসের টাকা পেয়েও শ্রমিকরা টাকা না পাওয়ায় মামলা করেছে। অপরাধ সংঘটনের ব্যাপারে তখন এটি স্পষ্ট হয়ে যায়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ড. ইউনূসের গ্রামীণ টেলিকম পরিদর্শনে যান। সেখানে গিয়ে তারা শ্রম আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতে পারেন। এর মধ্যে ১০১ জন শ্রমিক-কর্মচারীকে স্থায়ী করার কথা থাকলেও তাদের স্থায়ী করা হয়নি। শ্রমিকদের অংশগ্রহণের তহবিল ও কল্যাণ তহবিল গঠন করা হয়নি। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশের ৫ শতাংশ শ্রমিকদের দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়নি।
এই পরিপ্রেক্ষিতে শ্রম আইনে মামলা করে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। আলোচিত এই মামলায় ১ জানুয়ারি ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতের বিচারক বেগম শেখ মেরিনা সুলতানা গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. ইউনূসকে ৬ মাসের কারাদণ্ড এবং ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘যে দোষ করিনি, সেই দোষে শাস্তি পেলাম। এই দুঃখটা মনে রয়ে গেল।’
এদিকে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে আদালত কর্তৃক দণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি আপিল করার শর্তে তাকে আবার জামিনও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি ইউনূস সেন্টার। নানা সময় বিবৃতি দিয়ে প্রতিবাদ করা ইউনূস সেন্টার হঠাৎ কেন এতো নীরবÍ তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সবসময় সরব থাকা ইউনূস সেন্টারের নীরবতা কি তাহলে প্রমাণ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূস অপরাধী। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে চলছে ব্যাপক আলোচনা।
এ ব্যাপারে ইউনূস সেন্টারের বক্তব্য জানতে চেয়ে তাদের অফিসিয়াল ফোন নম্বরে ফোন করে এবং তাদের ওয়েব সাইটে ম্যাসেজ পাঠালেও কোনো জবাব দেয়নি ইউনূস সেন্টার।
তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের পক্ষে যিনি মামলা করেছেন তার সেই অধিকার নেই। সুতরাং এই মামলাটিই আইনত অবৈধ। তাছাড়া কোম্পানি আইনে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান- শ্রম আইনের ওই ধারা মানতে বাধ্য নয়।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের অভিযোগের জবাবে গত ৯ নভেম্বর আদালতে শুনানিতে আত্মপক্ষ সমর্থন করে ড. ইউনূসসহ অন্য বিবাদীদের পক্ষে দেওয়া বক্তব্যে বলা হয়, ‘গ্রামীণ টেলিকম যেসব ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করে, সেগুলো চুক্তিভিত্তিক। নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে তা নবায়নের মাধ্যমে পরিচালনা করা হয়। গ্রামীণ টেলিকমের প্রকল্প নোকিয়া কেয়ার ও পল্লী ফোনের কার্যক্রম তিন বছরের চুক্তি অনুযায়ী পরিচালিত হয়। মেয়াদ শেষে তা নবায়ন হয়। যেহেতু গ্রামীণ টেলিকমের কার্যক্রম চুক্তির ভিত্তিতে পরিচালিত, তাই গ্রামীণ টেলিকমের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গ্রামীণ টেলিকম কোম্পানি আইনের ২৮ ধারা অনুযায়ী একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। এর লভ্যাংশ বিতরণযোগ্য নয়। ফলে মূল লভ্যাংশের ৫ শতাংশ অংশগ্রহণ তহবিল ও কল্যাণ তহবিলে দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু গ্রামীণ টেলিকমের কর্মচারী ইউনিয়ন ওই অর্থ পাওয়ার আশায় শ্রম আদালতে মামলা করে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরকে জানানো হয়, বিষয়টি নিয়ে মামলা চলমান।’
উল্লেখ্য, শ্রমিকদের (আলোচিত প্রথম মামলা) মামলায় ৩০ নভেম্বর ড. ইউনূসের ব্যাখ্যা আমলে নিয়ে শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের আগের দেওয়া রায় বাতিল করেছে হাইকোর্ট। শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের রায়কে এখতিয়ারবহির্ভূত ঘোষণা করেন হাইকোর্টের বিচারক। লভ্যাংশ চেয়ে শ্রম আইনের ২৩১ ধারায় করা শ্রমিকদের মামলার রায়ে আদালত বলেছেন, গ্রামীণ কল্যাণের শ্রমিকরা মুনাফার অংশ পাবে কি না শ্রম আইন অনুসারে সে সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের নেই।
এ বিষয়ে গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, শ্রম আইনের ২৩১ ধারা অনুসারে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো চুক্তি হলে এবং সে চুক্তি নিয়ে কোনো বিরোধ সৃষ্টি হলে তা নিষ্পত্তি করার এখতিয়ার শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের আছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের সঙ্গে গ্রামীণ কল্যাণের কোনো চুক্তি না থাকায় বিরোধও ছিল না। ফলে শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের রায়টি এখতিয়ারবহির্ভূত ঘোষণা করে তা বাতিল করেছেন হাইকোর্ট।