কামরুন নাহার। চাকরি করেন দেশের বৃহৎ রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকার (ইপিজেড) অন্যান্যা এপারেলস গার্মেন্টসে। থাকেন চিটাগাংরোডের শিমড়াইল এলাকায়। প্রতিদিনই এখান থেকে তার ফ্যাক্টরিতে যেতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা।
সকাল ৮টার অফিস ধরতে বাসা থেকে বের হন প্রতিদিনই সকাল ৬টায়। শুধু তাই নয়, অফিস ছুটির পরও একই অবস্থা, ৫টায় ছুটি হলেও বাসায় ফিরতে সময় যায় আরো দু' ঘণ্টা। এমনিভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে সময় যাচ্ছে এই নারী শ্রমিকের। নিদারুণ এই যন্ত্রণায় শুধু কামরুন নাহারই নন, তার মতো আরো প্রায় বারো হাজার শ্রমিক যানজটে মধ্যে আসা-যাওয়ায় তীব্র কষ্টের মধ্যে রয়েছেন। অথচ বাসে যেতে ৫ মিনিটের বেশি সশয় লাগার কথা নয়।
নারায়ণগঞ্জ-আদমজী ইপিজেড-শিমরাইল সড়কে নিত্য এই যানজটের কারণে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে শ্রমিক ও যাত্রীদের। প্রতিটা দিনই যানজটের কবলে পড়তে হয় তাদের। শিমরাইল বাসস্ট্যান্ড, সিদ্ধিরগঞ্জ নদীবন্দরের প্রবেশমুখ, সিদ্ধিরগঞ্জ পুল, আদমজী ইপিজেড, কদমতলী পুল, দুই নং ঢাকেশ্বরী ও চৌধুরীবাড়ি বাসস্ট্যান্ড এলাকাগুলোতে যানজট লেগেই থাকে। বিশেষ করে কারখানাগামী শ্রমিক-কর্মচারিরা যানজটের কারণে যথাসময়ে কর্মস্থলে পৌঁছতে পারছেন না। তবে ইপিজেড কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা এ যানজট নিরসনের জন্য তাদের নিয়োজিত আনসার সদস্য, বেপজার সদস্যরা প্রতিদিন কাজ করছেন। এ বিষয়ে পুলিশ প্রসাশনের কাছে লিখিতভাবে জানালেও কোনো ফল পাননি তারা।
আজ মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জ-শিমরাইল সড়কের দুই পাশে শতাধিক গার্মেন্টস, বিশেষ করে আদমজী ইপিজেড ছাড়াও বিভিন্ন অফিস, কারখানা, ব্যাংক ও মার্কেট রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিনই হাজার হাজার শ্রমিক, কর্মচারি ও এলাকাবাসী যাতায়াত করছে। এ কারণে নারায়ণগঞ্জ-শিমরাইল সড়কে দিন দিন যানবাহনের যাতায়াত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে সকাল ৬টা থেকে সাড়ে ৯টা ও বিকেল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত যানজট লেগে থাকে এই সড়কটিতে।
পোশাক কারখানার শ্রমিকরা বলছেন, অফিস সময়ে সকাল থেকেই অটোরিকশা ও ইজিবাইকগুলো সড়কটি দখল করে নেয়। মহামারি করোনার কারণে ইপিজেডে শ্রমিকদের আনা নেওয়া করার জন্য যাত্রীবাহী বাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পরবর্তিতে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মসংস্থানে যেতে বেছে নিয়েছেন সরকার নিষিদ্ধ ইজিবাইক ও অটোরিকশা। এসকল পরিবহনে গাদাগাদি করে তারা আসা-যাওয়া করতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।
আদমজী ইপিজেয়ের সিমবা থ্রি-তে চাকরি করা হানিফ শেখ জানান, যানজটের এই চিত্র প্রতিদিনেরই। সকালের লেগে থাকা যানজট হালকা হতে দুপুর গড়িয়ে যায়। আবার বিকেলের লেগে থাকা যানজট কমে রাত ১০টার দিকে। এ অবস্থাতেই চলতে হয় আমাদের। তিনি বলেন, সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর বাসায় যাওয়ার সময় চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। এভাবে আর কয়দিন!
একই ফ্যাক্টরিতে চাকরি করা মোহাম্মদ জুবায়ের জানান, পোশাক কারখানায় যাত্রীবাহী বাস চলাচল যখন ছিল, তখন তেমন একটা যানজট ছিলো না সড়কে। নিষিদ্ধ অটোরিকশা, থ্রি-হুইলারের কারণে পুরো সড়কটি যানজটে পূর্ণ থাকে। মোড়ে মোড়ে স্টপেজ করায় প্রতিনিয়তই জট লেগে থাকে। তিনি বলেন, ইপিজেয়ের শ্রমিকদের আনা নেওয়ার বাস সার্ভিস চালু হলে অনেকটা কমবে যানজট। এছাড়াও ইপিজেড মোড়ে একটি ফ্লাইওভার হলেও যানজট কমে আসবে বলে জানান এই শ্রমিক।
মরিয়ম আক্তার নামে এক নারী পোশাকশ্রমিক বলেন, বাচ্চা-কাচ্চা সামাল দিয়ে অফিসে আসতে আসতে প্রতিদিনই দুর্ভোগে পড়ি। অটোতে চড়ে অফিস যেতেও ভয় পাই। করোনা মহামারির আগেও আমরা দিব্যি ভালোভাবে বাসে চড়ে অফিসে আসতাম। করোনার কারণে বন্ধ হওয়া বাস সার্ভিস আবারো সচল করার দাবি জানান এই নারীশ্রমিক।
হক সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আজিজুল হক জানান, এ সড়কে নিত্য যানজটের কারণে যথাসময়ে আসা-যাওয়া করা যায় না। এমন পরিস্থিতির জন্য ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকগুলোই সবচেয়ে বেশি দায়ী। এরা কোনো নিয়ম নীতি মানে না। যত্রতত্র থামিয়ে যাত্রী উঠানামা করছে। এর সাথে রয়েছে অটোরিকশা। এসব ধীর গতির যানবাহনের জন্য যানজট দীর্ঘ হচ্ছে।
শিমড়াইল মোড়ের দায়িত্বরত ট্টাফিক ইন্সপেক্টর মশিউর রহমান জানান, নিষিদ্ধ থ্রি-হুইলার বন্ধের জন্য আমরা ইতিমধ্যেই তাদের বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানাসহ বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছি।
রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকা (ইপিজেড) জেনারেল ম্যানেজার আহসান কবীর জানান, আমাদের ইপিজেড এলাকায় গার্মেন্টসগুলোতে শ্রমিকরা আসা-যাওয়ার সময় সকাল ও বিকেলে আনসার ও বেপজার সদস্যরা নিয়মিত কাজ করছেন। তিনি বলেন, সড়কে যানজট নিরসনের দায়িত্ব প্রশাসনের। এ বিষয়ে জেলা পুলিশের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে, যেন তারা দ্রুত যানজটমুক্ত করতে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম জানান, একজন টিআইসহ কয়েকজন ইন্সপেক্টর দেওয়া হয়েছে, তা অপ্রতুল। তিনি বলেন, নিষিদ্ধ অটোরিকশাগুলো সড়ক দখল করে সমাধানে কার্যকরী ভুমিকায় যাবেন তারা।
র্যাব-১১ এর অধিনায়ক তানভীর মাহমুদ পাশা জানান, গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে নিষিদ্ধ অটো বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখলে যানজট অনেকাংশেই কমে আসবে।