সন্তানদের কটুক্তি থেকে বাঁচাতে ৩৩ বছরে এসএসসি পাস বাবার
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Wednesday, 23 February, 2022, 5:16 PM
সন্তানদের কটুক্তি থেকে বাঁচাতে ৩৩ বছরে এসএসসি পাস বাবার
তোমার বাবা পড়াশোনা করেছে? কোন পর্যন্ত পড়েছে? সন্তানদের এমন সব প্রশ্ন থেকে বাঁচাতে বয়সের বাধা ডিঙিয়ে ৩৩ বছরের এসে এসএসসি পাস করেছেন বাবা।
এই বাবার নাম খিজির আহমেদ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হলের ৪ নং দোকানদার। এবার এসএসসি পরীক্ষায় উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রহমত উল্লাহ মডেল হাইস্কুল থেকে পেয়েছেন জিপিএ- ৩.৭৭।
এখন ইন্টারমিডিয়েট ভর্তি হবেন বলে জানান খিজির আহমেদ। তিনি বলেন, লেখাপড়া চালিয়ে যাবো। সন্তানদের জন্যই পড়ালেখা করেছি। জীবনের মাঝপথে পরীক্ষার ফলাফল পেয়ে আনন্দই আলাদা।
সেই আনন্দের খবর মন খুলে বলছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কাছে। বর্তমানে তার বয়স ৩৩ বছর পার। স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে আর বাবা-মা নিয়ে সংসার। বাবা আব্দুর রশিদ ও মা আমেনা বেগম।
সবাই গ্রামের বাড়িতে থাকেন। নিজে একাই কাজ করে চালান পুরো পরিবার।
খিজির আহমেদের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলায়। ১৯৯৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন। মুহসীন হলের গেইটে এক মামার দোকানে কাজ শুরু করেন। ২০০৫ সালের শেষদিক। পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে পড়ালেখা থেকে ছিটকে পড়েন তিনি। সেসময় সিতুষী উচ্চবিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। এটি চাঁদপুরের একটি স্কুল।
কিন্তু আশপাশের পড়ুয়া ছেলে-মেয়েদের দেখে তার মনে উদ্দীপনা কাজ করতো। আর ভাবতো সময় একদিন আসবে ‘আমি আবার পড়াশোনা করবো। স্কুলে গিয়ে ক্লাস করবো’। কিন্তু দেখতে দেখতে ১৬ বছর পার হয়ে যায়। সেভাবে আর পড়ালেখার প্রতি মনোযোগ দেয়া হয়ে ওঠেনি।
এখন তার সন্তানরা বড় হচ্ছে। মেয়ে আফসানা আক্তার এখন ৬ষ্ট শ্রেণিতে পড়ালেখা করছে আর ছেলে ইফতেকার আহমেদ আরফান পড়ছেন মাদরাসায় প্রথম জামাতে।
খিজিরের অশিক্ষিত হওয়ার কোনো প্রভাব যাতে ছেলেমেয়েদের উপর না পড়ে সে জন্য নতুন করে পড়াশোনা শুরু করতে চান। ২০১৭ সালে তিনি মুহসীন হলের দোকানে কাজ করা অবস্থায় বিভিন্ন ছাত্রদের পরামর্শে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস টেনে ভর্তি হন। কিন্তু কর্মব্যস্ততার কারণে সেখানেও ছিলেন অনিয়মিত।
অবশেষে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি রেজাল্ট প্রকাশ হলে সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছেন খিজির।
ফলাফল হাতে পেয়ে আনন্দের অনুভূতি ব্যাখ্যা করে বলেন, বয়স মাত্র ৩৩ শেষ হতে চললো। পড়ালেখা মাঝখানে করতে পারিনি পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব থাকায়। কিন্তু খুব বেশি ইচ্ছা ছিলো পড়ালেখার। সামনে দিয়ে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা হেটে গেলে মনে মনে ভাবতাম আবার পড়ালেখা করবো।
তিনি আরো বলেন, ফলাফলের খবর পেয়ে মেয়ে খুব খুশি। মেয়ের কথা হচ্ছে আমাকে আরো পড়ালেখা করতে হবে। আমারও ইচ্ছা আছে। যতো বাধাই আসুক পড়ালেখা চালিয়ে যাবো। এসএসসি পরীক্ষায় পাস করেছি একটি যোগ্যতা লাভ করেছি। সামনে আরো যোগ্যতা অর্জন করবো। তারপর দোকান ছেড়ে সরকারি চাকরি করার ইচ্ছা। পরীক্ষার ফলাফল আমার আশানুরূপ হয়েছে। এতে আমি অনেক খুশি।