বিশ্বব্যাপী একশ কোটির বেশি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। বাংলাদেশে শতকরা ২০ ভাগ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের রক্তচাপ বেশি। বয়স্কদের ক্ষেত্রে এ হার শতকরা ৪০-এর বেশি। এটি নীরবে নিভৃতে মানুষকে ধাবিত করে ভয়ানক পরিণতির দিকে। স্ট্রোক, হৃৎপিণ্ড বিকল হয়ে যাওয়া বা করোনারি ধমনি সংক্রান্ত হৃদরোগের পেছনে সিংহভাগ কারণ উচ্চ রক্তচাপ। এ জন্যই এটি নীরব ঘাতক।
শরীরচর্চার সুফল : রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন সক্রিয় থাকা, নিয়মিত শরীরচর্চা করা। শরীরচর্চা করলে হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি পায়, ফুসফুস চাঙ্গা থাকে। এতে মাংসপেশিতে রক্ত পরিবাহিত হয় এবং সহজে ফুসফুসে ফিরে আসে। রক্তজালিকা প্রসারিত হওয়ায় কোষে রক্ত সহজেই অক্সিজেন বহন করতে পারে। এতে হৃদপেশি শক্তিশালী হয়। এ কারণে হৃৎপিণ্ডের জন্য রক্তসঞ্চালন করা সহজতর হয়। রক্তনালির ওপর চাপ কম পড়ে।
এক গবেষণা বলছে, শরীরচর্চায় গড়ে ৩.৯ শতাংশ সিস্টোলিক রক্তচাপ কমে যায়। আর ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ কমে গড়ে ৪.৫ শতাংশ। শুধু রক্তচাপই কমে না, ওজনও নিয়ন্ত্রণে থাকে। শত্রু কোলেস্টেরলের মাত্রা নিচে নেমে আসে। ফলে রক্তনালির গায়ে চর্বি জমার সুযোগ কমে যায়, যা হৃদরোগ থেকে শরীর মুক্ত রাখতে সাহায্য করে।
শরীরচর্চার ধরন ও মাত্রা : শরীরচর্চা বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। হাঁটা, জগিং, সাইক্লিং, সাঁতার কাটা ইত্যাদি। এগুলো হলো এরোবিক শরীরচর্চা অর্থাৎ অক্সিজেন সহযোগে শরীরচর্চা। এতে হৃদস্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাস একটা নির্ধারিত লয়ে বাড়তে থাকবে। এনোরোবিক শরীরচর্চা অন্য ধরনের। এতে হঠাৎ করে শরীরে শক্তির প্রয়োজন পড়ে। খুব দ্রুততার সঙ্গে দৌড়ানো, ভারী জিনিস তোলা- এগুলো এনোরোবিক শরীরচর্চা। এটি সবার জন্য উপযোগী নয়। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ কিংবা হৃৎপিণ্ডের সুস্থতার জন্য প্রয়োজন এরোবিক শরীরচর্চা। এর মধ্যে একটা বয়সের পর হাঁটা উত্তম। মাত্রা হবে মাঝারি থেকে উচ্চ। আয়েশী মেজাজে হাঁটার কোনো মানে নেই। ঘাম ঝরিয়ে জোর কদমে হাঁটতে হবে।
যতটুকু হাঁটা : আমেরিকান কলেজ অফ কার্ডিওলোজি বা আমেরিকান হার্ট এসোসিয়েশন ২০১৯ সালে প্রকাশিত রিপোর্টে সুপারিশ করেছে, ৪০ মিনিট মাঝারি থেকে উচ্চ মাত্রার শরীরচর্চা। সপ্তাহে ৩-৪ দিন এমন শরীরচর্চা করার পরামর্শ দিয়েছে তারা। যদি একাধারে ৪০ মিনিট শরীরচর্চা করা কষ্টসাধ্য হয়, তবে ১০-১৫ মিনিটের ৩-৪টি সেশন করার বিকল্প পরামর্শ তারা দিয়েছে। আমেরিকান কলেজ অফ স্পোর্টস মেডিসিনের সুপারিশও এমন।
সক্রিয় রাখতে আরও করণীয় : নিজেকে সক্রিয় রাখতে পারলে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ সহজসাধ্য হয়। এ জন্য শরীরচর্চার পাশাপাশি আরও কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করুন। যেমন- লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করা সুস্থতার নিয়ামক। অনেকেই এমনকি তিন-চার তলায় ওঠার জন্য দীর্ঘ সময় লিফটের জন্য করিডরে অপেক্ষমাণ থাকেন। বিদ্যুতের বদলে ক্যালরি খরচ করুন। এতে শরীর ভালো থাকবে। গাড়ি ছেড়ে মাঝেমধ্যে হেঁটে অফিসে যেতে পারেন অথবা অফিসের আগের স্টেশনে নেমে হাঁটতে পারেন। বাড়ির টুকটাক কাজে সহযোগিতা করলে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি সংসারে সুখ নেমে আসে। বাগান করায় নির্মল আনন্দ লাভের পাশাপাশি সক্রিয় রাখা যায় নিজেকে। প্রতিদিন দশ হাজার কদম হাঁটা সুস্থ থাকার অন্যতম নিয়ামক। ইদানীং মোবাইল ফোনে অ্যাপস ব্যবহার করে নিজের দৈনন্দিন কত কদম ফেললেন, তা হিসেবে রাখা যায়। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে যাপিতজীবনে বেশ পরিবর্তন আনতে হয়। নিজেকে নিয়মিত সক্রিয় রাখা এবং শরীরচর্চা এর মধ্যে নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েও করতে পারেন।
লেখক : ক্লাসিফাইড মেডিসিন স্পেশালিস্ট ও এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট, সহযোগী অধ্যাপক