‘ওরা ভালো নেই। ওদের খুব মন খারাপ। তারা আমাকে জিজ্ঞেস করেছে- বাবা আমরা কি কোনো অপরাধ করেছি? আমাদের কেন এখানে এনে রাখা হয়েছে?’ ঢাকা মহানগর পুলিশের উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনে পুলিশ হেফাজতে থাকা দুই মেয়ে জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনা বাবা ইমরান শরীফকে এভাবেই প্রশ্ন করে। শরীফ নিজেই গতকাল বুধবার বিকালে এ তথ্য জানিয়ে আমাদের সময়কে বলেন, ‘তাদের (দুই মেয়ে) নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি। এখানে (ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার) করোনা-ডেঙ্গু হওয়ার ঝুঁকিসহ নানা শঙ্কা রয়েছে। ওরাও এখানে থাকতে চায় না।’
দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ইমরান জাপান থেকে দেশে আসেন গত ১৮ ফেব্রুয়ারি। এর পর মেয়েদের ফিরে পেতে গত ১৮ জুলাই বাংলাদেশে আসেন এরিকো। পরদিন হাইকোর্টে রিট করেন। সে অনুযায়ী দুই শিশুকে আগামী ৩১ আগস্ট হাজির করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। কিন্তু এর আগেই গত রবিবার রাতে বাবার কাছ থেকে তাদের নিয়ে আসে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এমনকি দুই শিশুকে উদ্ধারের দাবি করে তারা।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে উন্নত পরিবেশে দুই মেয়েকে রাখার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। সেখানে দুই শিশুর সঙ্গে তাদের বাবা-মা ৫ ঘণ্টা করে সময় কাটাতে পারবেন বলে আদেশে বলা হয়। গত সোমবার থেকে দুই মেয়েকে এখানেই রাখা হয়েছে। এর পর দিনের প্রথম ভাগে দুই সন্তানের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন জাপানি মা নাকানো এরিকো। আর দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দুই সন্তানকে আগলে রাখছেন তাদের বাবা ইমরান শরীফ। গতকাল বুধবারও সকালে মেয়েদের দেখতে সাপোর্ট সেন্টারে আসেন মা নাকানো। সঙ্গে নিয়ে আসেন খাবার। দুপুরের দিকে মেয়েদের জন্য খাবার নিয়ে সাপোর্ট সেন্টারে আসেন বাবা ইমরান শরীফ।
ইমরান শরীফ আমাদের সময়কে বলেন, ‘আদালত বলেছিলেন- আপনারা নিজেদের মধ্যে কথা বলে যদি কোনো সমাধানে আসতে পারেন। বুধবার সন্ধ্যায় এ নিয়ে মিটিং হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সে (নাকানো এরিকো) মিটিং বাতিল করে। আমি তার সঙ্গে কথা বলেছি, তাকে বলেছি- মেয়েরা এখানে থাকতে পারছে না। একটি ভালো হোটেলে তাদের থাকার ব্যবস্থা করি। কিন্তু সে কোনো বিষয়েই সহযোগিতা করতে চাইছে না।’ শরীফ আরও বলেন, ‘তারা (দুই মেয়ে) আমার সঙ্গে থাকতে না চাইলে তো বাংলাদেশে আসত না। জাপানে তারা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়েছে। ঢাকায় তারা থাকতে চাইলে এখানকার ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়বে। কোনো সমস্যা তো নেই। আমি তাদের বলেছি- তোমাদের যেটা ভালো লাগে সেটা করবে। যেখানে থাকতে মন চায় সেখানেই থাকবে।’
তবে ইমরান শরীফের অভিযোগের বিষয়ে নাকানো এরিকোর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার আইনজীবী শিশির মনির অবশ্য বলেন, ‘আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ৩১ আগস্টের আগ পর্যন্ত দুই শিশু ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে থাকবে। এর মধ্যে উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা সমাধানের পথ বের করার চেষ্টা করব।’
ইমরান শরীফ জানান, বড় মেয়ে জেসমিন মালিকার বয়স ১১ বছর। সে জাপানে ইংলিশ মিডিয়ামে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। মেজো মেয়ে লাইলা লিনার বয়স ৯ বছর ১০ মাস। সে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। জেসমিন বই পড়তে পছন্দ করে। লাইলার পছন্দ খাওয়া। বাংলাদেশি খাবার তার খুব পছন্দ। তারা বাংলা ভাষায় একটু একটু কথা বলতে পারে। বাংলা পড়ার চেষ্টা করে। বাংলা ভাষা বোঝে তারা। তিনি আরও জানান, তাদের ঘরে তিন কন্যাসন্তান। ছোটটির বয়স সাত বছর। সে তার মায়ের জিম্মায় রয়েছে।
এদিকে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার সূত্র জানিয়েছে, দুই বোন একই কক্ষে থাকছে রাতে। মা-বাবা দুজনই তাদের জন্য খাবার নিয়ে আসছেন প্রতিদিন। ঢাকা মহানগর পুলিশের উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের এক কর্মকর্তা জানান, মেয়ে দুটি পুলিশের হেফাজতে ভালো আছে।
ইমরান শরীফ জানান, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। ১৫ বছর যুক্তরাষ্ট্রে থাকার পর জাপানে যান। সেখানেই চিকিৎসক এরিকোর সঙ্গে পরিচয়। এর পর প্রেম। ২০০৮ সালে তারা বিয়ে করেন। বিয়ের সময় এরিকো ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। নাম পরিবর্তন করে রেখেছিলেন এসমা শরীফ। জাপানের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, বিয়ের পর তারা টোকিওতে বসবাস শুরু করেন। ২০ বছর জাপানে বসবাস করেন ইমরান। তাকে না জানিয়ে স্ত্রী ও শ্বশুর বাংলাদেশি মুদ্রায় ২০ কোটি টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট কেনেন কিস্তিতে। কোনো মালিকানা থাকলেও সেই কিস্তি পরিশোধ করতে হতো তাকে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া সন্তানরা কোন ধর্মের রীতিনীতি মেনে বড় হবে, ওদের খাবারের মেন্যুসহ ছোটখাটো নানা বিষয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। এর কিছুদিন পর থেকে আলাদা বসবাস শুরু করেন ইমরান ও এরিকো। তবে বিবাহবিচ্ছেদ হয়নি বলে জানান ইমরান।
জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনা গত জানুয়ারিতে স্কুলবাসে বাড়ি ফেরার পথে বাসস্টপ থেকে ইমরান তাদের অন্য একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে যান। এরিকো মেয়েদের নিজ জিম্মায় পেতে আদেশ চেয়ে সে দেশে গত ২৮ জানুয়ারি টোকিওর পারিবারিক আদালতে মামলা করেন। আদালত মেয়েদের সঙ্গে এরিকোর সাক্ষাতের অনুমতি দেন। এর মধ্যে ১৮ ফেব্রুয়ারি দুই মেয়েকে নিয়ে দেশে চলে আসেন ইমরান। এদিকে টোকিওর পারিবারিক আদালত গত ৩১ মে জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনাকে তাদের মায়ের জিম্মায় হস্তান্তরের আদেশ দেন। মেয়েদের তাই ফিরে পেতে গত ১৮ জুলাই বাংলাদেশে আসেন এরিকো।