সকাল আটটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত একটি বেসরকারি সংস্থার কাজ শেষ করেই শুক্লা হয়ে যান ‘লেডি ডেলিভারিম্যান’। রাত ১০টা পর্যন্ত ডেলিভারিম্যান হিসেবে কাজ করে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত ১১টা বেজে যায়। আগে বৃষ্টি হলে শুক্লা খুশিতে বলতেন—আহা। আর এখন আকাশে মেঘ দেখলেই প্রার্থনা করতে থাকেন যাতে বৃষ্টি না হয়। বৃষ্টি হলে মোটরসাইকেল চালিয়ে ভিজতে ভিজতেই গ্রাহকের বাড়ির দরজায় খাবার নিয়ে যেতে হয়। এক দিন কামাই করলেই তো মাসের মোট খরচে টান পড়বে।
শুক্লা জুলাই মাসের ৫ তারিখ থেকে খাবার পৌঁছে দেওয়া প্রতিষ্ঠান ফুডপান্ডায় ডেলিভারিম্যান হিসেবে কাজ শুরু করেছেন। হাসতে হাসতে বললেন, ২০১৮ সালে এ সংস্থাতেই হিসাব বিভাগে কাজ করার জন্য ডাক পেয়েছিলেন। তবে সাক্ষাৎকার দিতে যাওয়ার আগেই এক দুর্ঘটনায় পড়েন, সেখানে আর উপস্থিত হতে পারেননি। আর জীবনের তাগিদে এখন একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন ভিন্ন পরিচয়ে। বললেন, ‘বাবা স্ট্রোক করেন। এরপর থেকে চোখে প্রায় দেখতেনই না। তখন ভালো বেতনে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতাম। ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে বাবাকে ২০১৯ সালে ভারতের চেন্নাই নিয়ে যাই। দেশে-বিদেশে চিকিৎসায় এখন বাবা একটু একটু দেখেন, তবে কোনো কাজ করতে পারেন না। বাবা স্ট্রোক করার আগপর্যন্ত সংসারটা দেখতেন বাবা, আর পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে এখন দেখি আমি।’
রাজধানীর মিরপুরে শুক্লার বাবা কোনো রকমে একটি ফ্ল্যাট কিনেছিলেন, তাই বাড়িভাড়াটা লাগছে না। তবে ফ্ল্যাটের মেইনটেইনেন্সের নানান খরচ, বাবা ও মায়ের ওষুধ, দশম শ্রেণিপড়ুয়া ভাইয়ের স্কুলের বেতন, একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে বেকার থাকা বোনের খরচের পাশাপাশি শুক্লার নিজের খরচ তো আছেই। এ ছাড়া আছে একটি ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের চাপ। সব মিলে ফুডপান্ডার কাজটি করার সুযোগ পেয়ে শুক্লা একটু নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন বলে সংস্থাটির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন।
জোহা জামান কবির রশীদ ফার্ম থেকে শুক্লা চার বছরের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের কোর্স করেছেন। তবে পরীক্ষায় পাস করতে পারেননি সংসারের নানান ঝামেলায়। একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ভালো বেতনে কাজ করতেন শুক্লা। গত বছর করোনার প্রাদুর্ভাবে সেই প্রতিষ্ঠান তাঁকে ছাঁটাই করে। এরপর বন্ধু, স্বজনদের কাছ থেকে ধারদেনা করে চলেন কিছুদিন। বর্তমানে একটি কোম্পানিতে কাজ আর ডেলিভারিম্যান হিসেবে যা পান, তা দিয়েই সংসার চালাচ্ছেন।
শুক্লা জানালেন, গানের শিক্ষক হিসেবে চাকরি করা বাবা সব সময় বলতেন, মেয়েদের সব কাজ শিখে রাখা প্রয়োজন, কখন কোনটা কাজে লাগবে তা তো বলা যায় না। মোটরসাইকেল চালানো শিখেছিলেন শুক্লা। বন্ধু আনুশকা বেশ কয়েক বছর আগে মূল্যছাড়ে ৩৩ হাজার টাকা দিয়ে একটি মোটরসাইকেল উপহার দিয়েছিলেন। এখন সেই মোটরসাইকেলটিও বেহাল। আস্তে চালাতে হয়। দুদিন চালালেই তাকে গ্যারেজে পাঠাতে হয়। এরপরও এটি ছিল বলেই কিছুদিন রাইডার হিসেবে এবং পরে ফুডপান্ডায় কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন।
শুক্লা জানালেন, করোনার প্রাদুর্ভাবে লকডাউনে জ্যাম ছিল না বলে খাবার ডেলিভারি করা অনেকটাই সহজ ছিল। তবে বর্তমানে জ্যাম বেড়ে যাওয়ায় কাজটা কঠিন হয়ে গেছে। একজন নারী খাবার পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছেন, রাত করে বাড়ি ফিরছেন, তা অনেকেই পছন্দ করেন না। শুনতে হয় নানান কটু কথা। খাবার পৌঁছাতে দেরি হলে অনেকেই শেষ মুহূর্তে অর্ডার বাতিল করে দিলে তখন সময়-পরিশ্রম দুটিই বৃথা যায়। মেলে না পারিশ্রমিক।
কিছুদিন আগে সড়ক দুর্ঘটনায় পায়ে বেশ চোট পান শুক্লা। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হয়। তবে এ অবস্থাতেও বিশ্রাম নেননি। প্রতিদিনই ডেলিভারিম্যানের কাজটি করছেন। ফুডপান্ডা কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শুক্লা বললেন, এখানে তিনিসহ মোট চারজন নারী কাজ করছেন। আর অন্যরা সবাই পুরুষ। তবে যৌন হয়রানি বা খারাপ আচরণ কেউ করেন না। রাতের বেলায় ঝুঁকিপূর্ণ কোনো এলাকায় কাজের অর্ডার পেলে তা কর্তৃপক্ষকে জানালে তারাই তা পাল্টে দেন।
শুক্লা জানালেন, তাঁর বোন ফার্মাসিস্ট হিসেবে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। করোনায় তাঁর চাকরিটিও চলে যায়। শুক্লা বাসায় ছাত্রছাত্রীদের ব্যাচ করে পড়াতেন, করোনায় তা–ও বন্ধ হয়ে গেছে।
শুক্লা বললেন, ‘কয়েক বছর আগেও আমাদের অবস্থা বেশ ভালো ছিল। বাবা আমাদের তাঁর সাধ্য অনুযায়ী ভালো রেখেছিলেন। বাবার অসুস্থতা, করোনা সবকিছু পাল্টে দিয়েছে। মায়ের হার্নিয়া অপারেশন হচ্ছে না টাকার অভাবে। আমি একসময় দেশের বাইরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। স্বপ্ন দেখতাম নিজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে বিয়ে করব। এখন নিজের পরিবার নিয়েই হিমশিম খাচ্ছি, তাই বিয়ের কথা মাথাতেও আনতে পারি না। আর মা–বাবার পাশে দাঁড়ানোর সৌভাগ্য সব মেয়ের হয় না। আমি সুযোগটা পেয়েছি, তাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছি।’
ডেলিভারিম্যান হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতাও হয়েছে শুক্লার। জানালেন, দুর্ঘটনায় পায়ে ব্যথার জন্য একজন গ্রাহককে তিনতালা থেকে একটু নিচে নেমে আসার অনুরোধ করেছিলেন। সেই গ্রাহক রেগে খাবারটাই বাতিল করে দেন। অনেকে অর্ডার করার পর থেকেই বিরক্তি প্রকাশ করতে থাকেন কেন এত দেরি হচ্ছে। ফোন করে ঠিকানা চাইলেও অনেক গ্রাহক খেপে যান। আবার অনেকে বলেন, আপনি ‘লেডি ডেলিভারম্যান’, তা আগে বলবেন তো।
ফুডপান্ডার ভারী ব্যাগ নিয়ে কাজ করাটা অনেক পরিশ্রমের বলে জানালেন শুক্লা। রাত ১০টা পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে সাতটির মতো অর্ডার পান।
শুক্লা বললেন, ‘বাবার অসুখের সময় ব্যাংক থেকে সাত লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলাম। পাঁচ লাখ টাকা পরিশোধ করেছি। একবার ঋণের টাকা পরিশোধের জন্য মায়ের হাতের সোনার চুড়ি বন্ধক রেখেছিলাম। এ মাসেও ঋণের টাকা কোথা থেকে পরিশোধ করব, তা ভেবেই পাচ্ছি না। আর মেয়েরা সিএসিসি বা যা–ই পড়াশোনা করুক, চাকরির বাজারে এখনো বৈষম্যের শিকার হতেই হচ্ছে। একজন ছেলের যোগ্যতা কম থাকলেও বেশি বেতন দিতে সমস্যা হয় না, কিন্তু নারীদের বেলায় যোগ্যতা থাকলেও ভালো বেতন দিতে চায় না অনেক প্রতিষ্ঠান। নারীদের জন্য কাজের পরিবেশটাও এখনো বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। লোকজনের কথা শোনার ভয়ে ফুডপান্ডার ড্রেসটাও পরতে পারি না।’