২০১৯ সালে ঘটে যায় কিছু আলোচিত হত্যাকাণ্ড। এসব হত্যাকাণ্ডের কারণে বিশ্ব মিডিয়ায় শিরোনাম হয়েছে বাংলাদেশ। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য বরগুনার রিফাত, ফেনীর নুসরাত ও বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার হত্যাকাণ্ড।
নুসরাত হত্যা-
অধ্যক্ষের যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদ করায় ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের বিচার দাবিতে দেশব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়। ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত ৬ এপ্রিল পরীক্ষা শুরুর আগে পরীক্ষা কেন্দ্রের সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নুসরাতকে কৌশলে ডেকে নিয়ে তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়৷ অগ্নিদগ্ধ নুসরাতকে ঢাকায় এনে বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হলেও টানা পাঁচ দিন যন্ত্রণা সহ্য করে ১০ এপ্রিল মারা যান তিনি৷ এর আগে ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছিলেন নুসরাত৷ নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার দুদিন পর তার ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান আটজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করে হত্যাচেষ্টার মামলা করেন৷ নুসরাতের মৃত্যুর পর এটি হত্যা মামলায় পরিণত হয়৷
মামলার রায়
নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় গত ২৪ অক্টোবর ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত৷ হত্যাকাণ্ডের সাত মাসের মাথায় ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশীদ এ রায় দেন৷
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬জন আসামী
নুর উদ্দিন (২০)
শাহাদাত হোসেন শামীম (২০)
মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর (৫০)
সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের (২১)।
জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন (১৯)
হাফেজ আব্দুল কাদের (২৫)
আবছার উদ্দিন (৩৩)
কামরুন নাহার মনি (১৯)
উম্মে সুলতানা ওরফে পপি (১৯)
আব্দুর রহিম শরীফ (২০)
ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২)
ইমরান হোসেন ওরফে মামুন (২২)
রুহুল আমিন (৫৫)
মহিউদ্দিন শাকিল (২০)
মোহাম্মদ শামীম (২০)
মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা ছিলেন এই হত্যাকাণ্ডের হুমুকদাতা৷ প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির সহসভাপতি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমীন এবং সোনাগাজীর পৌর কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা মাকসুদ আলম এই হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নে আর্থিক সহযোগিতাসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছিলেন৷ আর কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা পপি ও জাবেদ হোসেন ছিলেন নুসরাতের সহপাঠী৷ রায়ে নুসরাতের পরিবারের সদস্যরার সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। একইসঙ্গে দ্রুত আসামীদের সাজা কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন তারা৷
আবরার হত্যাকাণ্ড-
ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেওয়ার জেরে গত ৬ অক্টোবর রাতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী। এরপর রাত ৩টার দিকে শেরেবাংলা হলের নিচতলা ও দোতলার সিঁড়ির করিডোর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরের দিন তার বাবা বরকতুল্লাহ বাদী হয়ে ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
২৫ জনকে আসামি করে চার্জশিট জমা
এ ঘটনায় ২৫ জনকে আসামী করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, চার্জশিট আদালতে পাঠানো হয়েছে। তদন্তে আমরা জানতে পেরেছি, আবরার হত্যায় সরাসরি অংশে নেয় ১১ জন। বাকি ১৪ জন হত্যাকাণ্ডে বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত রয়েছে।
এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইতোমপধ্যে প্রতিষ্ঠানটির ২৬ ছাত্রকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। ঘটনার পর বুয়েট কর্তৃপক্ষের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। যে ২৬ ছাত্রকে স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়েছে তাদের মধ্যে ২৫ জন আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের চার্জশিটভুক্ত আসামি।
গত ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের মূল ফটকের কাছে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় শাহনেওয়াজ ওরফে রিফাত শরিফ (২৬) নামের এক যুবককে। রিফাতকে কুপিয়ে হত্যার সেই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে তা পুরো দেশবাসীকে নাড়িয়ে দেয়। এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাস নয়ন বন্ডের নেতৃত্বে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। ঘটনার পরের দিন ১২ জনের নাম উল্লেখ করে ২৭ জুন বরগুনা সদর থানায় হত্যা মামলা করেছেন রিফাতের বাবা মো. আ. হালিম দুলাল শরীফ। ২রা জুলাই ঘটনার প্রধান আসামি সাব্বির আহম্মেদ ওরফে নয়ন বন্ড (২৫) পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়।
এরপর গত ১ সেপ্টেম্বর বিকেলে ২৪ জনকে অভিযুক্ত করে প্রাপ্তবয়স্ক ও অপ্রাপ্তবয়স্ক; এ দু ভাগে বিভক্ত করে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পুলিশ। এর মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক ১০ জন এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক ১৪ জন। যার মধ্যে নিহত রিফাত শরিফের স্ত্রী মিন্নির নামও উল্লেখ করা হয়। এরপর মিন্নি বেশ কিছুদিন পুলিশের হেফাজতে ছিলেন। জেলহাজতে অসুস্থ হয়ে পড়ায় আদালতের কাছে শর্ত সাপেক্ষে তিনি জামিন নেন। মামলার বাকি আসামীরা এখনও জেলখানায় আছেন। মামলা চলছে।