ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
বুধবার ৬ মে ২০২৬ ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩
পঞ্চপাণ্ডবের দখলে পরিবহন খাত
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Sunday, 24 November, 2019, 3:10 PM
সর্বশেষ আপডেট: Sunday, 24 November, 2019, 7:07 PM

পঞ্চপাণ্ডবের দখলে পরিবহন খাত

পঞ্চপাণ্ডবের দখলে পরিবহন খাত

গত বছর নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন আন্দোলনের পর পাস হয় সড়ক পরিবহন আইন। এতে সড়কে নিয়ম ভঙ্গে জরিমানা বেড়েছে হাজার গুণ পর্যন্ত, বেড়েছে কারাদণ্ডও। এটি কার্যকর করা হয় চলতি মাসের ১ নভেম্বর থেকে। কার্যকরের শুরুতেই ধাক্কা খেয়েছে বহুল আলোচিত সড়ক পরিবহন আইন। বরাবরের মতো বিরোধীতা করে আসছেন পরিবহন খাতের নেতারা।

একপর্যায়ে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের আন্দোলনে আইনের তিনটি ধারা প্রয়োগে প্রায় আট মাস ছাড় দেওয়া হয়।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও নেতারা বলেছেন, প্রস্তুতি ছাড়াই আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে সড়কে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। তাই পরিবহন নেতাদের দাবির কাছে সরকারকে নতিস্বীকার করতে হয়েছে। একবার ছাড় দেওয়ায় আইনটি ভবিষ্যতে কঠোরভাবে প্রয়োগ করার সম্ভাবনাও কমে গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারা দেশে অঘোষিত গণপরিবহন ধর্মঘটে যাত্রী জিম্মি করার মাধ্যমে আইন অমান্যের সংস্কৃতি বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছেন পরিবহন খাতের নেতারা। সরকার ও বিরোধী দলের পঞ্চপাণ্ডবের কাছে এখন জিম্মি দেশের সড়ক পরিবহন খাত। তাদের যাত্রীস্বার্থবিরোধী সংঘবদ্ধ তৎপরতার কারণে পরিবহন খাতের কোনো আইনই কার্যকর করা যাচ্ছে না। এমনকি কোনো নিয়ম-নীতিরও তোয়াক্কা করছেন না তারা।

সড়ক পরিবহন খাতের এই পঞ্চপাণ্ডব হলেন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি ও আওয়ামী লীগের সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মসিউর রহমান রাঙ্গা। তিনি জাতীয় পার্টির মহাসচিব। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের যুগ্মসম্পাদক এবং পরিবহন খাতের প্রভাবশালী নেতা শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী।

এছাড়া শাজাহান খানের নেতৃত্বাধীন সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের কেন্দ্রীয় নেতা। অন্যদিকে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ ঢাকা মহানগরী আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। তিনি আওয়ামী লীগে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত।

বর্তমানে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের নামে শীর্ষ এই পাঁচ নেতার কাছে জিম্মি হয়ে আছে পরিবহন খাত। তাদের সহযোগী হিসেবে সারা দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা সড়ক অকার্যকরে ভূমিকা রাখছেন।

পরিবহন খাতের পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান অন্যতম নিয়ন্ত্রক। তিনি একদিকে শ্রমিকনেতা, অন্যদিকে পারিবারিকভাবে পরিবহন কোম্পানির মালিক।

আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এই নেতা শ্রমিক ফেডারেশনের হয়ে পরিবহনে চাঁদা নির্ধারণ করে দেন। আবার তিনিই সরকারের সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, যার মূল কাজ এ খাতে চাঁদাবাজি বন্ধ করা।

পরীক্ষা ছাড়া লাইসেন্স আর দুর্ঘটনার পর জব্দ করা গাড়ি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ছেড়ে দেওয়ার দাবি নিয়েও তিনিই আন্দোলন গড়ে তোলেন। তার নেতৃত্বেই মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রভাবের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় পরিবহন খাতে।

ফেডারেশন নেতা শিমুল বিশ্বাস, ওসমান আলীদের নিয়ে তিনি রাজধানীর সেগুনবাগিচায় গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার দুই দিন ধরে বর্ধিত সভা করেছেন। এতে সিদ্ধান্ত হয়, নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংশোধন করা না হলে শ্রমিকরা গাড়ি চালাবেন না। সেই দাবি নিয়ে গতকাল রাতেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ধানমন্ডির বাসায় বৈঠক করেছেন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতারা।

বাস মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির সভাপতি মসিউর রহমান রাঙ্গা প্রকৃত পরিবহন ব্যবসায়ী নন। তিনি প্রধানত রাজনীতিক। জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির মহাসচিব ও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী। মালিক সমিতির এই শীর্ষ নেতার ‘সঞ্চিতা’ পরিবহন নামে চারটি মাত্র বাস রয়েছে। এগুলো রংপুরের অভ্যন্তরীণ রুটে চলে। পরিবহন খাতের বহুল আলোচিত নেতা খন্দকার এনায়েত উল্লাহ কয়েক বছর ধরে সড়ক পরিবহনের সামগ্রিক তৎপরতার নিয়ামক বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শাসনামলেই সমান তৎপর তিনি। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে পরিবহন সেক্টরের কর্তৃত্ব চলে যায় বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের হাতে। এ সময় মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বাধীন কমিটির সাধারণ সম্পাদক হন খন্দকার এনায়েত উল্লাহ। পরে মির্জা আব্বাসের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হলে খন্দকার এনায়েতের বাস ময়মনসিংহে নিয়ে আটকে রাখেন মির্জা আব্বাসের লোকজন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তৎকালীন এমপি ও সড়ক পরিবহন সমিতির সভাপতি মকবুল হোসেনের সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক হন খন্দকার এনায়েত। ২০০১ সালে বিএনপি আবার ক্ষমতায় এলে খন্দকার এনায়েত পরিবহন নেতৃত্বের বাইরে থাকলেও ওয়ান-ইলেভেনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকেই তিনি নগরীর টার্মিনালগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন। কমরেড খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ নেতা ওসমান আলীর পরিচিতি মূলত শ্রমিকনেতা। রাজনৈতিক পরিচয় তিনি আড়ালে রাখতে চান। তিনি দায়িত্ব পালন করছেন সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের মূল নেতৃত্ব সাধারণ সম্পাদক হিসেবে।

সরেজমিনে জানা যায়, মূলত চাঁদাবাজির কারণেই সংগঠিত দেশের সড়ক পরিবহন খাতে তৎপর মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলো। যানবাহন থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় ছাড়া মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের আর কোনো সাংগঠনিক তৎপরতা নেই। এ অবৈধ চাঁদার স্বার্থের সংঘাতে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন স্থানে সমিতিতে সমিতিতে কিংবা ইউনিয়নের মধ্যে বিরোধ, পরিবহন ধর্মঘট, রুট দখল-পাল্টা দখলের ঘটনা ঘটছে।

এক জেলার বাস যেতে পারে না অন্য জেলার ওপর দিয়ে। সড়ক, মহাসড়ক ও ফেরিঘাটে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যে বেহাল অবস্থা বাস-ট্রাক মালিকদের।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পরিবহন শ্রমিকদের জন্য মালিক সমিতি কিংবা শ্রমিক ইউনিয়নগুলো তেমন কোনো ভূমিকাই রাখে না। তারা মূলত পরিবহন খাতের অপরাধীদের সুরক্ষা দেওয়া এবং চাঁদাবাজির বিস্তারে ভূমিকা রাখে। সম্প্রতি নতুন সড়ক পরিবহন আইনের বিরোধিতা করে তারা জেলায় জেলায় শ্রমিকদের মাঠে নামিয়েছেন।

সারা দেশে বাস ও ট্রাক পরিবহন খাতে মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়ন মিলিয়ে ৫ শতাধিক সক্রিয় সংগঠন রয়েছে। এর মধ্যে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনভুক্ত সংগঠনের সংখ্যা ২০৩। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতি ৭০ ও ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সদস্য সংখ্যা রুট কমিটি ও মালিক সমিতি মিলিয়ে ১৪৪। বাকি সংগঠনগুলো ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত। সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন, ঢাকা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন ও ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান সমিতি এসব আঞ্চলিক ইউনিট নিয়ন্ত্রণ করে।

এসব ইউনিট কমিটি অনুমোদনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কমিটিকে এককালীন মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়। যাত্রী জিম্মি করে গত সপ্তাহের পরিবহন ধর্মঘটের ব্যাপারে মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশন দায় না নিলেও তাদেরই প্রত্যক্ষ ইন্ধনে সারা দেশে বাস বন্ধ ছিল বলে জানা গেছে।

শ্রমিক ইউনিয়নের নামে এসব মালিক ও শ্রমিক নেতার পূর্ণ সমর্থন ছিল। সংশোধনের নামে নতুন সড়ক পরিবহন আইন রুখে দেওয়ার চেষ্টায় কোনো কোনো জেলায় সপ্তাহ ধরে পরিবহন ধর্মঘট চলেছে। 

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status