ঘরে বাইরে বেশ চাপে পড়েছেন বিশিষ্ট আইনজীবী ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। একদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে তাঁর নেতৃত্ব প্রায় ‘অকার্যকর’ হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে নিজ দল গণফোরামেও তিনি কিছুটা চাপে পড়েছেন।
বলা হচ্ছে, বর্তমান কাঠামো দিয়ে ঐক্যফ্রন্ট আর এগোতে পারছে না। বিশেষ করে বেশি বয়স হওয়া ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্ব অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে ফ্রন্টভুক্ত দলগুলোর অনেক নেতা মনে করছেন।
তাঁরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে নতুন কাঠামো বা নেতৃত্ব তৈরি না হলে ঐক্যফ্রন্ট মুখ থুবড়ে পড়বে।
ড. কামালের বিরুদ্ধে গঠনতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ড, ব্যক্তিস্বার্থে ও অগণতান্ত্রিক পন্থায় দল পরিচালনাসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলেছেন তাঁর দলেরই সভাপতিমণ্ডলীর ছয় সদস্য।
তবে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া বলেছেন, গণফোরামের ছয় সদস্য যেসব অভিযোগ করেছেন তা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয় দলের কাছে। তিনি বলেন, ওই ছয়জনের সবাই এখন দলেও নেই। তা ছাড়া এগুলো তাঁরা কাউন্সিলের আগে করতে পারতেন। অথচ তখন তারা সাহস দেখাননি।
গত ১২ অক্টোবর ড. কামালের উদ্দেশে একটি চিঠি দেন দলের ছয় নেতা। এতে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বৃহত্তর কর্মিসভা ডেকে গণফোরামের গঠনতন্ত্রের ধারা ও আদর্শ সমুন্নত রাখার দাবি তোলা হয়েছে। অন্যথায় তাঁরা ভিন্ন পথ দেখবেন বলে জানিয়েছেন। গত ২৬ এপ্রিল কাউন্সিলে গঠিত কমিটি নিয়েও দলটির মধ্যে কিছুটা অস্থিরতা আছে বলে জানা যায়। ওই সময় মোস্তফা মহসিন মন্টুকে বাদ দিয়ে সাধারণ সম্পাদক করা হয় ড. রেজা কিবরিয়াকে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, জোট গড়ার এক বছর পর নেতৃত্বের কাঠামো পরিবর্তন করার আলোচনা শুরু হয়েছে ঐক্যফ্রন্টভুক্ত দলগুলোর মধ্যে।
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না গত সোমবার বলেন, ‘ড. কামাল হোসেনের একক নেতৃত্বে নয়, যৌথ নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্ট পরিচালিত হচ্ছিল। তাঁকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। তবে তাঁর শারীরিক অবস্থা ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে এটা বলা চলে যে এ ধরনের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দিতে পারবেন—এমন আশা করাটা ভুল হবে।’
এ প্রসঙ্গে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘স্যারের (ড. কামাল হোসেন) শরীর মাঝেমধ্যে ভালো-খারাপ থাকে এটি সঠিক। কিন্তু মালয়েশিয়ার ড. মাহাথির মোহম্মদেরও এমন অবস্থা ছিল। সেই অর্থে তাঁর বিকল্প নেতৃত্ব পাওয়া কঠিন। কেননা একটি ঐতিহাসিক প্রয়োজনের সময় তিনি নেতৃত্বে এসছেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘তার পরও কাঠামো পরিবর্তনের আলোচনা একটি নতুন আইডিয়া। সবাই মিলে আলোচনা করা যায়। তবে সব দলের কাছে ওই নেতৃত্বকে অবশ্যই গ্রহণযোগ্য হতে হবে।’
গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘কামাল হোসেন স্যারের বয়স ৮৪ বছরের বেশি। মাঠে-ময়দানের কাজ এখন আর তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তবে চাইলে তিনি অর্নামেন্টালি থাকতে পারেন।’
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ফ্রন্টকে গতিশীল করতে জোটভুক্ত দলগুলোর নেতাদের পর্যায়ক্রমে নেতৃত্বে আনার জন্য সম্প্রতি ফ্রন্টের এক বৈঠকে প্রস্তাব দিয়েছেন মাহমুদুর রহমান মান্না। যদিও ওই প্রস্তাব এখনো গ্রহণ করা হয়নি। তবে সম্প্রতি ড. কামাল হোসেনের ভূমিকার কারণে ফ্রন্টের প্রধান নেতার দায়িত্ব পুনর্বণ্টন জরুরি—এমন আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে।
বিএসএমএমইউ হাসপাতালের প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ড. কামাল হোসেন দেখতে যাবেন বলে সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েও পরে মত পাল্টেছেন। এতে বিএনপিসহ ফ্রন্টভুক্ত দলগুলোর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘২০ অক্টোবরের বৈঠকে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক রেজা কিবরিয়া ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে কথা বলেই আমাদের নিশ্চিত করেছিলেন যে তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনকে দেখতে যাবেন। এখন মত পাল্টালে বা না গেলে সেটি তাঁর বিষয়।’
তিনি বলেন, বয়স বা অসুস্থতার বিষয় থাকতে পারে। তবে অবশ্যই এমন পরিস্থিতিতে দেশের মানুষের মধ্যে ভুল বার্তা যায়।
গত বছরের ১৩ অক্টোবর গঠিত হওয়ার পর থেকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন ৮৪ বছর বয়সী কামাল হোসেন। ইদানীং প্রায়ই তিনি অসুস্থ থাকেন। চিকিৎসাসহ নানা কাজে বছরের বেশির ভাগ সময় তাঁকে বিদেশে থাকতে হয়। আবার অনেক কিছু তাঁর মনেও থাকে না। অন্যদিকে ড. কামালের উপস্থিতিতে বিএনপি নেতাকর্মীরাও আর আগের মতো কর্মসূচিতে থাকছেন না। দলটির মধ্যে আলোচনা আছে—বঙ্গবন্ধুর নাম তিনি বেশির ভাগ বত্তৃদ্ধতায় উল্লেখ করলেও জিয়াউর রহমানের নাম এখনো নেননি।
এদিকে সরকারের বিরুদ্ধে ‘ঝুঁকি’ নেওয়ার প্রশ্নেও ড. কামাল হোসেনের কিছুটা দ্বিধা রয়েছে বলে তাঁর ঘনিষ্ঠ কেউ কেউ মনে করেন। ফ্রন্টভুক্ত একটি দলের নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যত দূর বুঝতে পারছি ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনের মতো ঝামেলায় পড়তে এই বয়সে তিনি ভয় পাচ্ছেন। তাই খালেদা জিয়াকে দেখতে যাওয়ার আগ্রহ থাকলেও শেষ মুহূর্তে তিনি মত পরিবর্তন করেছেন।
ড. কামালের নেতৃত্বের ‘দুর্বলতা’ ছাড়াও ঐক্যফ্রন্টের বৈঠক ডাকা থেকে শুরু করে কর্মসূচি প্রণয়ন পর্যন্ত সব কিছুই এখন চলছে সমন্বয়হীনভাবে। ফ্রন্টের মুখপাত্র আসলে কে—এ নিয়েও জোটের মধ্যে অস্পষ্টতা রয়েছে। আর এ জন্যই সক্রিয় ও কার্যকর একজন নেতাকে সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া জরুরি বলে বিএনপিসহ ফ্রন্টভুক্ত কয়েকটি দল মনে করছে।
সূত্র মতে, বিএনপির প্রবীণ নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম এমন আলোচনায় বেশি আসছে। ড. কামাল হোসেন নির্বাচন করতে রাজি না হওয়ায় ড. মোশাররফ ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ গত বছর নভেম্বর মাস থেকে ঐক্যফ্রন্টের বৈঠকে যাচ্ছেন না। এ কারণেও ঐক্যফ্রন্টের কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতা তৈরি হয়েছে বলে আলোচনা আছে। তাই বিএনপিতে আলোচনা হলো দলের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত করতে হলে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের কোনো নেতাকে দায়িত্ব দিতে হবে। তবে মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুল বেশি ব্যস্ত থাকায় ড. মোশাররফই এ ক্ষেত্রে যথোপযুক্ত নেতা। ড. মোশাররফ অবশ্য এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন. ‘আমি অনেক দিন যাবৎ ঐক্যফ্রন্টের বৈঠকে যাই না।’
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত সোমবার বলেন, ঐক্যফ্রন্টের কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। তবে একে গতিশীল করতে আরো কী কী করণীয় তা আলোচনা করে ঠিক করা হবে। সূত্র : কালের কণ্ঠ