ই-পেপার সোমবার ● ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
সোমবার ● ৫ অক্টোবর ২০২৬ ● ২০ আশ্বিন ১৪৩৩
শেখ হাসিনা ইস্যুতে ভারতের অবস্থান কী, হাইকমিশনারের কথায় মিলল যে বার্তা
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Monday, 5 October, 2026, 2:22 PM

শেখ হাসিনা ইস্যুতে ভারতের অবস্থান কী, হাইকমিশনারের কথায় মিলল যে বার্তা

শেখ হাসিনা ইস্যুতে ভারতের অবস্থান কী, হাইকমিশনারের কথায় মিলল যে বার্তা

বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সামরিক বিমানে করে ভারতে যাওয়া এবং তখনকার পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের ভূমিকা নিয়ে ঢাকায় দেশটির হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর মন্তব্যে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে যখন নতুন করে আলোচনা চলছে, তখন তার বক্তব্যকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।

গত শনিবার (৩ অক্টোবর) ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনাকে কবে ফেরত পাঠানো হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বিষয়টি একটি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। আদালত সংশ্লিষ্ট থাকায় এ বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তবে শেখ হাসিনা কীভাবে ভারতে গেলেন, সেই প্রসঙ্গেও হাইকমিশনারের বক্তব্য নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, শেখ হাসিনাকে ভারতীয় বিমান বাহিনী বা সেনাবাহিনী ভারতে নিয়ে যায়নি। বাংলাদেশের তৎকালীন পরিস্থিতির কারণে তিনি ভারতে এসেছিলেন এবং ওই সময় প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাস্তবতাকে গ্রহণ করা ছাড়া ভারতের সামনে খুব বেশি বিকল্প ছিল না।

যদিও দিনেশ ত্রিবেদী ঢাকায় যা বলেছেন সেটি শেখ হাসিনা ভারতে যাওয়ার পরদিন অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট ভারতের সংসদের উচ্চ-কক্ষ রাজ্যসভায় দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর যে বক্তব্য দিয়েছিলেন তা থেকে ভিন্ন কিছু নয় বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এ নিয়ে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ মনে করছেন, দীনেশ ত্রিবেদী মূলত বোঝাতে চেয়েছেন, শেখ হাসিনার ভারতে যাওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনা এবং এ জন্য ভারতকে এককভাবে দায়ী করার সুযোগ নেই। আবার কারও মতে, শেখ হাসিনাকে সামরিক বাহিনী নিয়ে যায়নি—এ বিষয়টি জোর দিয়ে তুলে ধরে ভারত তার দায়ের জায়গাটি স্পষ্ট করতে চেয়েছে।

অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করছেন, বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগ্রহেরও ইঙ্গিত দিয়েছে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে ২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল।

এমন প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা-দিল্লি, দুই পক্ষ থেকেই সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল।

সবশেষ দুই পক্ষের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে সংকটের মধ্যেই গত ২৯ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর একটি সাক্ষাতের পর তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের ইস্যুটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

কী বলেছেন ভারতীয় হাইকমিশনার
ঢাকায় একটি বেসরকারি সংস্থার আয়োজনে একটি সম্মেলনের কর্মঅধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে দীনেশ ত্রিবেদী শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে কথা বলেছিলেন। মূলত ‘শেখ হাসিনাকে কবে হস্তান্তর করা হবে’ এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি কথাগুলো বলেছেন।

তিনি বলেছেন, ভারত সরকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের মাধ্যমে বারবার এটি বলেছে যে এর একটি প্রক্রিয়া রয়েছে। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে আইনি বিষয় জড়িত এবং এটি একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত। ‘সে কারণে এ বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। যেহেতু আদালত যুক্ত রয়েছে, তাই কেউ এ নিয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেধে দিতে পারে না।’

শেখ হাসিনার ভারতের যাওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে দিনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, ‘হাসিনাজিকে ভারতীয় বিমান বাহিনী বা সেনাবাহিনী নিয়ে আসেনি। ওই সময় বাংলাদেশের বিয়োগান্ত ঘটনার কারণে তিনি এসেছিলেন। নিরপরাধ মানুষের প্রাণ দেওয়ার এমন ঘটনা সংঘটিত হওয়া উচিত ছিল না। আমরা আশা ও প্রার্থনা করি যেন এমন ঘটনা আর কখনো না ঘটে, যেখানে নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারায়। তা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তেই তা হোক না কেন।’

ভারতের হাইকমিশনার বলেন, সামরিক বিমানটি (শেখ হাসিনাকে বহনকারী) যখন ভারতে এসেছিল, তখন তার জন্য ভারত প্রস্তুত ছিল না।

‘আমি টিভিতে দেখছিলাম এবং স্ক্রলে লেখা উঠছিল যে তিনি অন্য কোনো দেশে যাচ্ছেন। হাসিনাজি তখনো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আমাদের প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাস্তবতাকে গ্রহণ করা ছাড়া খুব কম বিকল্পই ছিল। কারণ, পরিস্থিতি কখনো এমন হয় যে যার জন্য আপনি আগে থেকে প্রস্তুত থাকেন না। আমাদের আর উপায় কী ছিল? আমরা যদি বলতাম--না, আমরা আপনাকে অবতরণের অনুমতি দেব না, তবে পরিস্থিতি কী হতো আমি জানি না। সে কারণে এটিই এর ঐতিহাসিক কারণ।’

তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যেই চমৎকার সম্পর্ক ও বিভিন্ন পর্যায়ে সহযোগিতার ব্যবস্থা আছে এবং তিনি মনে করেন জাতীয় স্বার্থে উভয় দেশেরই সমান বন্ধু হিসেবে সংযোগ রাখা উচিত।

জয়শঙ্কর কী বলেছিলেন
শেখ হাসিনার ভারতে যাওয়া ও প্রত্যর্পণ ইস্যুতে দীনেশ ত্রিবেদীর মন্তব্য স্বাভাবিক কারণেই আলোচনায় উঠে এসেছে।

একই সঙ্গে সামনে আসছে ভারতের রাজ্যসভায় দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর শেখ হাসিনা ইস্যুতে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট যে বিবৃতি দিয়েছিলেন সেটিও।

সেই বিবৃতির এক পর্যায়ে তিনি বলেছিলেন, ‘. কারফিউ থাকা সত্ত্বেও ৫ আগস্ট বিক্ষোভকারীরা ঢাকায় জড়ো হন। আমাদের জানা মতে নিরাপত্তা বিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকের পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন।’

‘খুব কম সময়ের নোটিশে তিনি সাময়িকভাবে ভারতে আসার অনুমতি চান। একই সঙ্গে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ফ্লাইট ক্লিয়ারেন্সের জন্যও অনুরোধ আসে আমাদের কাছে। তিনি গতকাল সন্ধ্যায় দিল্লি পৌঁছেছেন।’

কী বোঝাতে চাইলেন ভারতীয় হাইকমিশনার
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতীয় হাইকমিশনার ঢাকায় বাংলাদেশি ও বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রতিনিধিদের সামনে মূলত পরিষ্কার করে বোঝাতে চেয়েছেন যে, শেখ হাসিনা ইস্যুটি বাংলাদেশের এবং এতে ভারতকে দোষারোপ করা বা ভারতের এ বিষয়ে নিজ থেকে কিছু করার সুযোগ নেই।

ভারতীয় রাজনীতিক দিনেশ ত্রিবেদী ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর আয়োজনের চেষ্টা করে যাচ্ছেন বলে অনেকের ধারণা।

যদিও বাংলাদেশের সরকারি মহল থেকে বারবারই শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের ইস্যুটি সামনে আনা হয়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রেও সরকার এটিকে অনেকটা শর্ত হিসেবে তুলে ধরেছে।

গত ১৬ আগস্ট বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম প্রেস ব্রিফিংয়ে স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, ‘দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের দ্রুত ফেরত পাঠাতে এবং শহীদ শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ঘাতকদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়েছি। বাংলাদেশ এই জবাবের অপেক্ষায় আছে।’

ভারতের ওপি জিন্দাল ইউনিভার্সিটিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ও দীর্ঘদিনের বাংলাদেশ গবেষক শ্রীরাধা দত্ত অবশ্য বলছেন, হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী নতুন কিছু বলেননি, বরং তিনি যা বলেছেন সেটিই ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য।

‘আমার মনে হয় না এর আর কোনো অর্থ আছে। এর মাধ্যমে ভিন্ন কিছু বোঝানোর চেষ্টা হয়েছে বলেও মনে হয় না। ওখানে (হাইকমিশনার যে অনুষ্ঠানে মন্তব্যগুলো করেছেন) ইন্টারন্যাশনাল অডিয়েন্স ছিল। সেজন্য হয়তো তিনি আরও স্পষ্ট করে সরকারের অবস্থানটাই তুলে ধরেছেন,’ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

যদিও বাংলাদেশি বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে অতোটা সাদামাটা ভাবে দেখতে রাজি নন। তাদের কারও কারও মতে, হাইকমিশনার আগের চেয়ে বেশি ‘দৃঢ়তার সাথে’ সামরিক বাহিনীর বিমানে শেখ হাসিনার ভারত যাওয়া এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা গেছেন- এই কথাগুলো মনে করিয়ে দিয়েছেন।

‘আমার মনে হয় হাইকমিশনার বলতে চেয়েছেন যে বিষয়টা বাংলাদেশের। এ নিয়ে একপাক্ষিকভাবে ভারতের ওপর দায় চাপানোর সুযোগ নেই। তবে যেহেতু ভারত জড়িয়ে গেছে সেজন্য হয়তো আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধানের ওপর তিনি জোর দিয়েছেন,’ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমীন আবার বলছেন যে, হাইকমিশনারের বক্তব্যে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের দিকে এগিয়ে নেওয়ার একটি আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

‘বিষয়গুলো তুলে ধরে তিনি আসলে বোঝাতে চেয়েছেন যে এক জায়গায় আটকে না থেকে আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে। মনে হচ্ছে উনি চাইছেন যে দুই দেশ আলোচনায় বসুক বা কথা বলুক। এক্ষেত্রে হয়তো শীর্ষ বৈঠক বা দুই প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের প্রয়োজন আছে। কারণ এটা হলে বাকীগুলো নিয়ে এগুনো সহজ হবে,’ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status