তিন কোটি টাকা নিয়ে সমবায় সভাপতির উধাওয়ের অভিযোগ, তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Thursday, 1 October, 2026, 8:25 PM
তিন কোটি টাকা নিয়ে সমবায় সভাপতির উধাওয়ের অভিযোগ, তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি
গাজীপুরের কাপাসিয়ায় শুভেচ্ছা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের প্রায় তিন কোটি টাকা নিয়ে সভাপতি আবুল হাসেম উধাও হয়েছেন—এমন অভিযোগের পর তদন্তে নেমেছে সমবায় অফিস। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বুধবার (১ অক্টোবর) গাজীপুর জেলা সমবায় কার্যালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এর আগে ‘কোটি টাকা নিয়ে সমবায় সমিতির সভাপতির উধাও হওয়ার অভিযোগ’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হলে বিষয়টি সমবায় বিভাগের নজরে আসে। এরপর গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জেলা সমবায় কার্যালয়। পরিদর্শন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আজ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
গাজীপুর জেলা সমবায় অফিসার আরিফা সুলতানা শিপা বলেন, ‘ঘটনাটি নিয়ে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। গতকালের পরিদর্শন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আজ কমিটি গঠন করা হয়েছে।’
কমিটিতে রয়েছেন জেলা সমবায় অফিসের উপসহকারী নিবন্ধক মনিরা আখতার, পরিদর্শক মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ও সহকারী পরিদর্শক রায়হান উদ্দিন।
সমবায় অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালে ১০৯৮ নম্বর নিবন্ধনের মাধ্যমে শুভেচ্ছা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের কার্যক্রম শুরু হয়। পরে কাপাসিয়ার দুর্গাপুর ইউনিয়নসহ আশপাশের সাতটি ইউনিয়নের বাসিন্দাদের সমিতির সদস্য করা হয়।
সদস্যদের অভিযোগ, গত ১৭ সেপ্টেম্বর সমিতির কার্যালয়ে তালা দিয়ে চলে যান সভাপতি আবুল হাসেম। এরপর থেকে কার্যালয়টি বন্ধ রয়েছে। টাকা ফেরত পেতে প্রতিদিন সেখানে ভিড় করছেন সদস্যরা।
সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সমিতির সদস্য ছিলেন ৪৯৬ জন। বর্তমানে সদস্য সংখ্যা প্রায় এক হাজার বলে দাবি তাদের। ১৫ শতাংশ মুনাফার আশ্বাসে অনেকে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে টাকা তুলে সমিতিতে জমা রেখেছেন। সদস্যদের দাবি, বর্তমানে সমিতির মূলধনের পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি টাকা।
তবে উপজেলা সমবায় কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তিন কোটি টাকা নিয়ে সভাপতি পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কাপাসিয়া উপজেলা সমবায় অফিসার মাহফুজুল আমিন বলেন, ‘গ্রাহকদের তথ্য অনুযায়ী, সভাপতি তিন কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছেন। তার মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি কীভাবে অফিসটি খোলা যায়।’
তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত সদস্যদের পক্ষ থেকে থানায় ও গাজীপুর আদালতে দুটি মামলা করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সমবায় অফিসও তদন্ত করছে।
গত সোমবার কাপাসিয়ার রাওনাট বাজারে সমিতির কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, তিনতলা ভবনটির নিচের দোকানপাট ও ওপরের তলায় থাকা সমিতির অফিস তালাবদ্ধ।
রাওনাট বাজার সমিতির সভাপতি সফিকুল আলম বলেন, ‘আবুল হাসেম পালিয়ে গেছেন। সদস্যরা টাকার জন্য প্রতিদিন এখানে এসে অপেক্ষা করছেন। অনেকে জীবনের শেষ সম্বলটুকু এই সমিতিতে রেখেছেন।’
সদস্য সালমা বেগম ও সুবর্ণা আক্তার জানান, তারা দুজন মিলে সমিতিতে এক লাখ আট হাজার টাকা জমা রেখেছিলেন। সভাপতি টাকা নিয়ে চলে যাওয়ার পর তারা জমা টাকা ফেরত পাচ্ছেন না।
চাপাত মাঝিবাড়ি গ্রামের সদস্য নিখিল দাসের দাবি, সমিতিতে তার দুই লাখ ১০ হাজার টাকা জমা রয়েছে। ফুলবাড়িয়া গ্রামের আরেক সদস্য জানান, তার ছয় লাখ টাকা সমিতিতে জমা রয়েছে।
এদিকে জেলা সমবায় কার্যালয়ের পরিদর্শন ও সমিতির কার্যক্রম তদারকি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন সদস্য। তাদের অভিযোগ, নিয়মিত পরিদর্শন ও নির্বাচনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম যথাযথভাবে করা হয়নি।
তবে জেলা সমবায় অফিসার আরিফা সুলতানা শিপা জানান, সমিতিটি তালাবদ্ধ বা টাকা নিয়ে সভাপতি চলে যাওয়ার বিষয়ে তার কাছে আগে কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। তিনি বলেন, ‘অভিযোগ পেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সমিতির কার্যক্রম একজন সভাপতির অনুপস্থিতিতে বন্ধ থাকার কথা নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমিতি একটি ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কোনো একজন সদস্য বা কর্মকর্তা চলে গেলেও অন্যদের মাধ্যমে কার্যক্রম চালানোর সুযোগ রয়েছে।
সমিতির সভাপতি আবুল হাসেম (৪৬) কাপাসিয়া থানার দড়িমেরুন গ্রামের মৃত আব্দুল হাইয়ের ছেলে। তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।
এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের মাধ্যমে সমিতির প্রকৃত সদস্যসংখ্যা, মূলধন, আমানতের পরিমাণ এবং কার্যালয় বন্ধ হওয়ার কারণসহ অভিযোগগুলোর সত্যতা কতটা, তা পরিষ্কার হবে।