ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
রোববার ২৩ আগস্ট ২০২৬ ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে ফের বিনিয়োগ খরার শঙ্কা
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Sunday, 23 August, 2026, 11:35 AM

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে ফের বিনিয়োগ খরার শঙ্কা

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে ফের বিনিয়োগ খরার শঙ্কা

সমাপনী অর্থবছরের শেষ মাস জুনে ৭৫১ কোটি (৭.৫১ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য আমদানি করেছেন ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা। এই অঙ্ক আগের আর্থিক বছরের জুনের চেয়ে ৭১ দশমিক ০৮ শতাংশ বেশি; আর পৌনে চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

নতুন সরকার আসার পর আমদানি বাড়াকে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছিলেন অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও ব্যবসায়ী নেতারা। তারা বলছেন, অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক কারণে দীর্ঘদিন ধরে দেশে বিনিয়োগে খরা চলছে।

অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতায় দেশে বিনিয়োগ সহায়ক অনুকূল পরিবেশ না থাকায় ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ না করে বসেছিলেন। সে কারণে শিল্প খাতের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি কম হওয়ায় সামগ্রিক আমদানিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল।

নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসায় দেশের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে শুরু করেছে। সবার মধ্যে আস্থা ফিরে আসতে শুরু করেছিল। নতুন হিসাব-নিকাশ কষে বিনিয়োগের ছক কষছিলেন। শিল্প স্থাপন ও সম্প্রসারণের জন্য মূলধনি যন্ত্রপাতিসহ (ক্যাপিটাল মেশিনারি) অন্যান্য পণ্য আমদানি বাড়ায় সামগ্রিক আমদানিতে গতি আসছিল। বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটার আভাস পাওয়া যাচ্ছিল।

কিন্তু গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট সেই সম্ভাবনাকে ভেস্তে দিচ্ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও ব্যবসায়ী নেতারা। তারা বলছেন, দ্রুত এ সমস্যার সমাধান না হলে সংকটে থাকা অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আমদানি সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২২ সালের নভেম্বরে ৭ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছিল। এরপর আর কোনো মাসেই সাড়ে ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য আমদানি হয়নি দেশে। দু-এক মাস ছাড়া বেশির ভাগ মাসের আমদানি ব্যয় ছিল ৫ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে।

৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ৬ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছিল। প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৪ দশমিক ৯২ শতাংশ। দ্বিতীয় মাস অগাস্টে তা কমে ৫ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। সেপ্টেম্বরে বেড়ে ৬ দশমিক ২১ বিলিয়নে ওঠে। অক্টোবরে কমে ৫ দশমিক ৬২ শতাংশে নামে।

নভেম্বরে ৫ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়। ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে আমদানির অঙ্ক ছিল যথাক্রমে ৬ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন, ৬ দশমিক ৫৩ ও ৬ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার।

মার্চে অবশ্য তা কমে ৫ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারে নামে। এপ্রিলে এক লাফে বেড়ে ৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে ৭ দশমিক শূন্য সাত বিলিয়ন ডলারে ওঠে।

মে মাসে ৬ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়। সবশেষ জুন মাসে তা সাড়ে ৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে ৭ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারে ওঠে।

অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৮৯ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছিল দেশে; যা ছিল আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি।

২০২২-২৩ অর্থবছরে তা কমে ৭৫ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে; কমেছিল ১৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা আরও কমে ৬৬ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলারে নামে; কমেছিল ১১ দশমিক ১১ শতাংশ।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কিছু বেড়ে ৬৮ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে ওঠে; বেড়েছিল ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

গত ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরে ৭৫ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারের বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি হয়েছে; প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক শূন্য সাত শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, গত অর্থবছরে বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান নিয়ামক মূলধনি যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারি) আমদানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ৮০ শতাংশ।

এই আর্থিক বছরে ৩ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছিল। আগের অর্থবছরে আমদানির অঙ্ক ছিল ২ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্পের মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি বেড়েছে ১৫ দশমিক ২০ শতাংশ; ৪৭ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের যা ছিল ৪১ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার।

শিল্পের মধ্যবর্তী পণ্য হলো এমন কাঁচামাল বা উপকরণ, যা চূড়ান্ত পণ্য তৈরির লক্ষ্যে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। প্লাস্টিক, তৈরি পোশাক, পাট ও হালকা প্রকৌশলসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্প খাতে এই পণ্যগুলো উৎপাদন ও রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পের প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি ৪ শতাংশ কমেছে। এ খাতে ১৭ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। আগের অর্থবছরে খরচ হয়েছিল ১৮ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার।

ডলার সংকটের কারণে আমদানি ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরতে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছিল; তার সুফলও মিলেছিল। আমদানি ব্যয় বেশ কমে এসেছিল। মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারও সেই একই পথ অনুসরণ করে চলে।

‘গণতন্ত্রহীনতা’ নিয়ে সমালোচনার জবাবে উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে দেখিয়ে আসত আওয়ামী লীগ। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে যে অস্থিরতা-অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার আসায় দেশে স্বস্তি ফিরে আসতে শুরু করে।

ছোট-বড় সব ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসতে শুরু করে। দেশে বিনিয়োগের একটি আবহ তৈরি হয়েছে। এতদিন যারা অপেক্ষা করছিলেন, পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুকূলে আসায় তারা এখন বিনিয়োগ করবেন বলে মাঠে নেমেছেন।

আর এ কারণেই আমদানি ব্যয় বাড়ছিল বলে মনে করেন বিশ্ব ব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।

গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, “অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার কারণে যে সব বিনিয়োগকারী এতদিন হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন, অপেক্ষা করছিলেন অনুকূল পরিবেশের জন্য। সেই পরিবেশটা আসায় তারা নতুন পরিকল্পনা সাজিয়ে বিনিয়োগ ছক কষছিলেন। নতুন শিল্প-কলকারখানা স্থাপন ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিচ্ছিলেন।”

‘এ সব কারণে ক্যাপিটাল মেশিনারি, শিল্পের কাঁচামালসহ অন্যান্য পণ্য আমদানি বাড়তে শুরু করেছিল’ মন্তব্য করে জাহিদ হোসেন বলেন, “নতুন সরকারের ছয় মাস হয়েছে। শুরুটা ভালোই হয়েছিল। সবাইকে আশা জাগিয়েছিল। এরই মধ্যে বাজেট দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বাজেটে বিনিয়োগ বাড়িয়ে অর্থনীতিতে গতি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

“এজন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই তহবিল থেকে কম সুদে ঋণ পাবেন উদ্যোক্তারা। নীতি সুদহার (রেপো রেট) ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। সব মিলিয়ে বিনিয়োগ বাড়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। আর তাতেই আমদানি বাড়ছিল।”

অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, “বিদেশি মুদ্রার মজুদ এখন মোটমুটি সন্তোষজনক আছে। আমদানি বাড়লেও খুব একটা সমস্যা হবে না।

“কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে এখন বড় সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে জ্বালানি সংকট। দিন যত যাচ্ছে সংকট ততই বাড়ছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান না হলে কিন্তু সব ভেস্তে যাবে।”

ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, “ডলার-সংকট কেটে গেছে। রিজার্ভ বাড়ছেই। ডলারের দামও নিম্নমুখী হয়েছে।

“ক্যাপিটাল মেশিনারি ও শিল্পের প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি বাড়া খুবই ভালো লক্ষণ হিসেবে দেখছিলাম আমরা। মনে হচ্ছিল—বিনিয়োগে যে মন্দা চলছিল, তা কেটে যাবে। অর্থনীতি গতি পাবে।”

দেশে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কারখানাগুলোতে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে বলে ভাষ্য ব্যবসায়ী নেতা বাংলাদেশ চেম্বারের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজের।

গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, “এই সংকটের ফলে শিল্প খাত গভীর বিপর্যয়ে পড়েছে। সংকট বড় করে প্রচার হওয়ায় তৈরি পোশাক খাতের বিদেশি অর্ডার হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।” 

উচ্চ হারে বিল দিয়েও সময়মতো জ্বালানি না পাওয়ায় ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ঋণ খেলাপি হওয়ার আশঙ্কায় আছেন জানিয়ে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি পারভেজ বলেন, “নতুন সরকার আসল। আমরা ভেবেছিলাম এখন সব কিছু ভালোভাবে শুরু হবে। অনেকে অনেক পরিকল্পনা করলেন বিনিয়োগ করার। কিন্তু সবকিছু কেমন যেন হয়ে গেল।

“জ্বালানি সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপন তো দূরে থাক; যেগুলো আছে, সেগুলো টিকে থাকবে কি না—সেটিই এখন প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।”

ব্যবসা ও কর্মসংস্থান বাঁচাতে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের পাশাপাশি জরুরি সুরক্ষা বা ‘রেসকিউ প্যাকেজ’ দেওয়ার দাবি জানান ইভিন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status