ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
সোমবার ৩ আগস্ট ২০২৬ ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
তীব্র গ্যাস সংকটে খরচ বেড়ে দ্বিগুণ, ঝুঁকিতে শিল্প-কারখানার উৎপাদন
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Monday, 3 August, 2026, 4:27 PM

তীব্র গ্যাস সংকটে খরচ বেড়ে দ্বিগুণ, ঝুঁকিতে শিল্প-কারখানার উৎপাদন

তীব্র গ্যাস সংকটে খরচ বেড়ে দ্বিগুণ, ঝুঁকিতে শিল্প-কারখানার উৎপাদন

দেশে চলমান গ্যাস সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে উৎপাদনমুখী শিল্পখাতকে। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় অনেক শিল্প-কারখানা উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখতে বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর নির্ভর করছে।

এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে, যা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে।

একই সঙ্গে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট দেশের পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো উৎপাদনে ঘন ঘন বিঘ্ন ঘটায় নির্ধারিত সময়ে ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। 

উৎপাদন বিলম্বিত হওয়ায় কঠিন হয়ে পড়ছে নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি চালান পাঠানো। যা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা নষ্ট হওয়া, ক্রয়াদেশ বাতিল ও ভবিষ্যতে নতুন রপ্তানি আদেশ হারানোর আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলছে।

এই পরিস্থিতি দ্রুত নিরসনে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে দেশের উৎপাদন, রপ্তানি আয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাবের মুখে পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন শিল্প মালিকরা।

বড় সংকটে রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্প
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি ও মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবানা হক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গ্যাস ও বিদ্যুতের চলমান সংকট এখন তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন সচল রাখতে কারখানাগুলোকে দীর্ঘ সময় ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।’

গাজীপুর কারখানায় প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা এবং নারায়ণগঞ্জ কারখানায় প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ডিজেল দিয়ে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে বলে জানান তিনি। ডিজেলের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে বলে জানান এই শিল্প উদ্যোক্তা।

রুবানা বলেন, ‘সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বাবদ মোট ইউটিলিটি বিল প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। একদিকে জ্বালানি সংকট, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়- এই দুইয়ের চাপ শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।’

দ্রুত এ সংকটের সমাধান না হলে সময়মতো রপ্তানি আদেশ সরবরাহ, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখা ও কর্মসংস্থান রক্ষা- সবই বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে দাবি করেন তিনি।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন কী পরিমাণ কমেছে তার সুর্নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমে গেছে।’

‘চলমান গ্যাস সংকট অনেক কারখানার জন্য সাময়িকভাবে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ ছাড়া কারখানা পরিচালনা যেমন কঠিন হয়ে পড়েছে, তেমনি বিকল্প জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যয় বহন করাও অনেক উদ্যোক্তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না,’ বলেন তিনি।

বিজিএমইএর এ নেতা বলেন, ‘গ্যাস সংকট এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এখন তাদের ব্যবসায়িক কৌশল নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে কিছু কারখানাকে আপাতত উৎপাদন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের মালিকদের।’

‘অবৈধ সংযোগ’ নিতে নদীর তলদেশে পাইপে ছিদ্র, দেড় মাস ধরে বের হচ্ছে গ্যাস
তিনি বলেন, ‘কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে না পারলেও শ্রমিকদের পুরো বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে উৎপাদন সচল রাখতে ডিজেল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অতিরিক্ত ব্যয়ও বহন করতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় কার্যত দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে, যা অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য টেকসই নয়।’

ভোগ্যপণ্য সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিতে পারে
শুধু তৈরি পোশাক শিল্প নয়, গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে দেশের প্রায় সব উৎপাদনমুখী শিল্পখাতেই। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে এবং সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে স্থানীয় বাজারের সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে। এর ফলে উৎপাদন, পণ্য সরবরাহ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ভোক্তাপণ্য উৎপাদনকারী একটি প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় বাজারে পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা নিয়ে আমরা গভীর উদ্বেগের মধ্যে আছি। আমরা আশা করেছিলাম সরকার বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট দ্রুত সমাধান করতে সক্ষম হবে। কিন্তু সংকট নিরসনের পরিবর্তে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘উৎপাদন সংকট এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোক্তাপণ্যের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিতে পারে।’

তিনি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘তা না হলে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে, যার প্রভাব সরাসরি পণ্যের দামে পড়বে এবং মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।’

বাংলাদেশ ফ্লেক্সিবল প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফপিআইএ) সভাপতি ও টাম্পাকো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাফিউস সামি আলমগীর গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গ্যাস সংকটের কারণে আমরা চরম সমস্যার মধ্যে আছি। আমাদের এলাকা থেকে শুরু করে ফ্যাক্টরিগুলোতে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্য। কোনোভাবেই জেনারেটর বা বার্নার চালাতে পারছি না। বাধ্য হয়ে ডিজেল কিনে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে।’

ডিজেল সংগ্রহ করাও এখন ঝামেলার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানান তিনি।

গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে জানিয়ে বলেন, ‘পরে ডিজেল দিয়ে উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু ডিজেল ব্যবহার করলে স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যায়।’

কারখানার অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের ফ্যাক্টরি টঙ্গীতে। শুধু টঙ্গী নয়, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়াসহ সব জায়গাতেই একই ধরনের গ্যাস সংকট চলছে।’

যে কারণে গ্যাস সংকট
মহেশখালী উপকূলে স্থাপিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি পুনঃগ্যাসীকৃত এলএনজি (আরএলএনজি) সরবরাহ কমে গেছে। এতে দেশের সামগ্রিক গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের আবাসিক, শিল্প ও সিএনজি খাতে স্পষ্টভাবে পড়ছে।

তবে এফএসআরইউটির মেরামত কাজ কবে শেষ হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময় জানাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ফলে টার্মিনালটি পুনরায় চালু হয়ে জাতীয় গ্রিডে স্বাভাবিকভাবে গ্যাস সরবরাহ শুরু না হওয়া পর্যন্ত চলমান সংকট অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানা গেছে।

তিতাসের অপারেশন ডিভিশনের মহাব্যস্থাপক প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমাদের দৈনিক চাহিদা প্রায় দুই হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। আমরা এখন পাচ্ছি ১২শ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। এর মধ্যে ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুট বিদ্যুৎ খাতে, ৭০ মিলিয়ন ঘনফুট সার উৎপাদনে এবং বাকি গ্যাস অন্য খাতে দেওয়া হচ্ছে।’

এফএসআরইউ মেরামতের পর সরবরাহে না ফিরলে আপাতত সংকট কমছে না বলেও জানান তিনি।

তবে রোববার (২ আগস্ট) চলমান গ্যাস সংকট সমাধান হতে আরও এক সপ্তাহের বেশি অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে জানান পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন্স অ্যান্ড মাইনস) মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মহেশখালীতে ক্ষতিগ্রস্ত এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউটি সারিয়ে তুলতে বিশেষজ্ঞ টিম কাজ করছে। পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে ১০ আগস্ট পর্যন্ত লাগতে পারে।’

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status