ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
মঙ্গলবার ২৩ জুন ২০২৬ ৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বিপর্যস্ত আওয়ামী লীগের বিধ্বস্ত ঠিকানাগুলো এখন যেমন আছে
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Tuesday, 23 June, 2026, 9:38 PM

বিপর্যস্ত আওয়ামী লীগের বিধ্বস্ত ঠিকানাগুলো এখন যেমন আছে

বিপর্যস্ত আওয়ামী লীগের বিধ্বস্ত ঠিকানাগুলো এখন যেমন আছে

গুলিস্তান এলাকার ২৩ আবরার ফাহাদ অ্যাভিনিউতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের দিন ১০ তলাবিশিষ্ট ভবনটি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। চলে ভাঙচুর ও লুটতরাজ। এর পর থেকে ভবনটি পরিত্যক্ত। গতকাল সোমবার তোলা মামুনুর রশিদ

ধ্বংসস্তূপ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু ভবন। গুলিস্তানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে রাখা হয়েছে হকার ও শ্রমজীবী মানুষের জিনিসপত্র। ধানমন্ডিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয় পুলিশি পাহারায় রাখা হয়েছে। শেখ হাসিনার ধানমন্ডির বাসভবন ‘সুধা সদন’ এখন ভাসমান মানুষের আশ্রয়স্থল।

এমনই অবস্থা গণঅভ্যুত্থানে পতিত আওয়ামী লীগের বিধ্বস্ত ঠিকানাগুলোর। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর ভবনগুলোতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও আগুন দিয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়। গতকাল সোমবার এসব স্থাপনা ঘুরে আরও জানা গেল, গণঅভ্যুত্থানের প্রায় দুই বছর পরও সেগুলো ‘অভিভাবকবিহীন’ অবস্থায় পড়ে আছে।

বঙ্গবন্ধু ভবনের নিরাপত্তা জোরদার 
ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু ভবন এখন ধ্বংসস্তূপ। তবে ভবনের ভেতরে থাকা সব গাছে নতুন পাতা গজিয়েছে। আগুনে পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া নারকেল, আম গাছসহ সব গাছই নতুন পাতায় শোভিত। ভবনের সামনে নতুন করে কয়েকটি গাছের জন্ম হয়েছে। যেন ধ্বংসের মধ্যেও নতুন প্রাণ সৃষ্টি। 

তবে ভবনটিতে এখন সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ। সাংবাদিক ছাড়া অন্য কেউ ছবি তুলতে গেলে বাধা ও জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হয়। সেখানে ২৪ ঘণ্টা পুলিশ পাহারা থাকছে। ৩২ নম্বর সড়কের দুই পাশের প্রবেশপথে তাঁবু গেড়ে অবস্থান নিয়েছে ধানমন্ডি থানার একাধিক দল।

ঘুরে দেখা গেল, ভেঙে ফেলা বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে নতুন গজানো গাছগুলোর কারণে এক ধরনের প্রাকৃতিক দেয়াল তৈরি হয়েছে। তবে গাছগুলোর ফাঁক গলিয়ে কেউ যাতে ভেতরে ঢুকতে না পারে, সে জন্য গাছের গায়ে তার দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছে। অনেক মানুষ সেখানে এখনও ভিড় জমায়। সড়ক থেকে উঁকিঝুঁকি মেরে ভেতরটা দেখার চেষ্টা করে। ধ্বংসপ্রাপ্ত বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর এবং লেকসংলগ্ন শ্রদ্ধা নিবেদনের বেদিসহ (আগে যেখানে বঙ্গবন্ধুর বিশাল প্রতিকৃতি ছিল) আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখে। বেদির সামনের খোলা জায়গায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পুলিশের গুলিতে মারা যাওয়া বাবুর্চি কামাল হোসেন স্মরণে একটি ‘স্মৃতিফলক’ স্থাপন করা হয়েছে।

চব্বিশের ৫ আগস্ট বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা বঙ্গবন্ধু ভবনে আগুন, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত ভবনটির ভেতর থাকা মুক্তিযুদ্ধের দুর্লভ স্মৃতিচিহ্নের পাশাপাশি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের স্মৃতিচিহ্নগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। সে সময় আরও তিনটি ভবন এবং সান্তুর রেস্টুরেন্টে ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়। ভবনের সামনে স্থাপিত বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিসহ অন্যান্য স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে বঙ্গবন্ধু ভবনে আরেক দফা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়। সে সময় এক্সক্যাভেটর (খননযন্ত্র), ক্রেন এবং বুলডোজার এনেও ভাঙচুর চালানো হয়। পরের তিন-চার দিনও হাতুড়ি ও শাবল দিয়ে ভাঙাভাঙি ও লুটপাট  অব্যাহত রাখে কিছু মানুষ। 

হকারদের মালপত্র রাখা আর নেশাখোরদের আড্ডা কেন্দ্রীয় কার্যালয় 

রাজধানীর গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ব্যবহৃত হচ্ছে হকার ও শ্রমজীবী মানুষের জিনিসপত্র রাখার জায়গা হিসেবে। সেইসঙ্গে এখন এটি মাদক ও নেশার আড্ডাস্থলও।

কার্যালয়টির আশপাশের এলাকার নাম ছিল ‘বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ’। স্বাধীনতার পর থেকে এই নামেই এলাকাটি পরিচিত ছিল। তবে ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর নতুন নামকরণ করা হয় ‘শহীদ আবরার ফাহাদ অ্যাভিনিউ’। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আওয়ামী লীগ কার্যালয়-সংলগ্ন সড়কের ফুটপাতে নতুন নামকরণ-সংক্রান্ত সাইনবোর্ডও বসিয়েছে। 
আশপাশের মানুষ জানায়, গণঅভ্যুত্থানের এক বছর আওয়ামী লীগ কার্যালয় পরিত্যক্ত ছিল। ভবনের বিভিন্ন অংশে মাদক কারবার এবং মল-মূত্র ত্যাগ করত পথচারী ও হকাররা। পরে কে বা কারা ‘জুলাইযোদ্ধার প্রধান কার্যালয়’ ব্যানার টানিয়ে দেয় সেখানে। গত বছরের জুলাইয়ে কার্যালয়টি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে ‘আন্তর্জাতিক ফ্যাসিজম ও গণহত্যা গবেষণা ইনস্টিটিউট’ নামে ব্যানার টাঙানো হয়। সোমবারও ভবনের প্রবেশপথের বামপাশে ‘জাতীয় শ্রমিক শক্তি’র নামে কয়েকটি ছোট ব্যানার ঝুলতে দেখা দেখা গেছে।

ঘুরে দেখা গেছে, জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা ভবনটি দখলকালে মূল প্রবেশপথে নতুন লোহার গেট বসিয়েছে। গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকতে দেখা যায়, তৃতীয় তলা পর্যন্ত হকার ও শ্রমজীবী মানুষের জিনিসপত্রে ঠাসা। টেবিল, চেয়ার ও ছোটখাটো আসবাব, এমনকি ফুচকার স্টল হিসেবে ব্যবহৃত ভ্যানগাড়িও রাখা আছে। পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তলায় চলে বখাটেদের আড্ডা এবং মাদক সেবন ও বিক্রির কার্যক্রম। বাকি তলাগুলোতে ময়লা-আবর্জনা ও মলমূত্রে পরিপূর্ণ থাকায় ঢোকার মতো পরিবেশও নেই।

পুলিশ পাহারায় ধানমন্ডি আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়
২০০১ সালে ধানমন্ডি ৩/এ সড়কের ৫১ নম্বর বাড়িটি ভাড়া নিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়। ২০০৯ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে তিন তলা মূল ভবনটি দলের নামে কিনে নেয় আওয়ামী লীগ। ২০১৪ সালে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে পাশের চার তলাবিশিষ্ট আরও দুটি ভবন কিনে দলের সভাপতির কার্যালয়টিকে আরও সম্প্রসারণ করে দলটি।  

চব্বিশের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়ের এই তিনটি ভবনই আগুন লাগিয়ে ও ভাঙচুর করে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। মূল ভবনের প্রবেশমুখে ইস্পাতের তৈরি বিশাল গেটসহ অন্য ভবনের লোহা ও কাঠের গেট এবং দরজা-জানালা উপড়ে ফেলে ভেতরের সব জিনিসপত্র লুটে নেওয়া হয়। ওই বছরের সেপ্টেম্বরের প্রথম দিক পর্যন্ত ভবনগুলো অরক্ষিত অবস্থায় ছিল। পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে ‘ট্রিপল এস’ নামে একটি সংগঠন ভবনের ভেতরে বন্যার্তদের জন্য ত্রাণ কার্যক্রম চালায়। কয়েকটি কক্ষ পরিষ্কার করে ত্রাণসামগ্রী রেখেছিলেন তারা। পরে তাদের সরিয়ে সব ভবনসহ গোটা এলাকায় পুলিশ পাহারা বসানো হয়। সেই থেকে প্রায় দুই বছর ধরে সেখানে পুলিশের পাহারা অব্যাহত রয়েছে।    
 
ঘুরে দেখা গেল, মূল ভবনের প্রবেশপথসহ সব ভবনের ভেঙে ফেলা দরজা-জানালার জায়গায় ব্যারিকেড ও ভারী কাঠের বাটাম মেরে বন্ধ করা হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ নেই। মূল ভবনের গেটের সামনে একজন চায়ের দোকানি দোকান নিয়ে বসেছেন। 

ভাসমান মানুষের আশ্রয়স্থল সুধা সদন

ধানমন্ডি ৫ নম্বর রোডের ৫৪ নম্বরের ‘সুধা সদন’ নামের বাড়িটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ধানমন্ডির বাসভবন হিসেবে পরিচিত। এটি শেখ হাসিনার স্বামী প্রয়াত পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম ওয়াজেদ মিয়ার তৈরি, তাঁর নামেই বাড়িটির নামকরণ করা হয়েছিল।

গণঅভ্যুত্থানের দিন এই সুধা সদনে হামলা ও ভাঙচুর চালানোর পর সেনাবাহিনীর সদস্যরা এসে তালাবদ্ধ করে দেন। পরে ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বুলডোজার দিয়ে ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধু ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার সময় সুধা সদনেও আরেক দফা অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর আর লুটপাট চালিয়ে প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়। 
ঘুরে দেখা গেল, চারতলা ভবনটির কাঠামো বাদে কিছুই অবশিষ্ট নেই। প্রবেশপথে ‘সুধা সদন’ লেখা নামফলকটির অস্তিত্বও নেই। ভেঙে ফেলা মূল প্রবেশ গেটের উন্মুক্ত অংশটি আড়াআড়িভাবে বিদ্যুতের তার দিয়ে আটকে রাখা। সামনে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুতের তার রাখার ‘স্টিল ড্রাম’ রেখে মানুষের ঢোকা বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে সংলগ্ন ছোট গেটটি উন্মুক্ত থাকায় আশপাশের শ্রমজীবী ও ভাসমান মানুষ অবাধে ভবনের ভেতরে আসা-যাওয়া করেন।

ভবনের নিচতলা পুড়ে যাওয়া আসবাব ও ময়লা-আবর্জনায় পরিপূর্ণ থাকলেও দোতলা থেকে চারতলা পর্যন্ত কক্ষগুলোতে কয়েকজন ভাসমান মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। ভবনের সামনের সড়ক থেকে এর তৃতীয় তলার ব্যালকনিতে একজন নারীর সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি দ্রুত ঘরের ভেতর ঢুকে পড়েন। 

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status