খেলার মাঠে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই বিশেষ কিছু। প্রতিবেশী দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কে বিদ্যমান শীতলতা এতটাই যে, যেকোনো খেলায় দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াই বাড়তি উত্তাপ ছড়ায়। মাঠ থেকে সেই উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে সীমান্তের এপার-ওপার। ‘কেউ কারে নাহি ছাড়ে’- দুই দলের এমন দুর্দমনীয় মনোভাব সাধারণ ম্যাচকেও রূপ দেয় মহারণে। যে মহারণ দেখার জন্য চাতক পাখির মতো অপেক্ষায় থাকেন ক্রীড়াপ্রেমীরা। তাদের সেই অপেক্ষার অবসান হচ্ছে, মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়ামে আজ এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি হকি টুর্নামেন্টে মুখোমুখি হচ্ছে ভারত আর পাকিস্তান। বেলা সাড়ে ৩টায় শুরু হবে ম্যাচ। ওই মহারণের পর সন্ধ্যা ৬টায় দক্ষিণ কোরিয়া পরীক্ষায় নামবে স্বাগতিক বাংলাদেশ।
টুর্নামেন্টে নিজেদের প্রথম ম্যাচে টুনার্মেন্টের ফেভারিট ভারতের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে কিঞ্চিৎ ঝলকানি ছাড়া কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি বাংলাদেশ। ফলে ঘরের মাঠে প্রতিবেশী দেশের কাছে ৯-০ গোলের বড় ব্যবধানে ভরাডুবি হয় স্বাগতিকদের। সেই হতাশা কাটতে না কাটতেই আজ আশরাফুলদের নামতে হচ্ছে কোরিয়া পরীক্ষায়। শক্তি-সামর্থ্য বিবেচনায় ঢের পিছিয়ে লাল-সবুজ দল। তবে সাম্প্রতিক ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলতে এবং ভালো কিছুর প্রত্যাশা নিয়েই আজ টার্ফে নামবে গোবিনাথন কৃষ্ণমূর্তির শিষ্যরা।
২০১৮ সালে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসের পর আর কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেনি বাংলাদেশ। গোবিনাথনের অধীনে ১০-১২ দিন অনুশীলন করে খেলতে নেমেছেন জিমি-আশরাফুলরা। এর আগে ঘরোয়া হকিতে খেলেছেন তারা। তবে ঘরোয়া হকি আর আন্তর্জাতিক হকির সঙ্গে পার্থক্য যে অনেক, সেটা তারা হাড়ে হাড়েই টের পাচ্ছেন। ভারতের কাছে দেখতে হয়েছে বড় হার। এই ভারতকেই উদ্বোধনী ম্যাচে ২-২ গোলে রুখে দেওয়া দক্ষিণ কোরিয়াও যে গোলোৎসব করতে চাইবে, সেটা বুঝে নিতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় স্বাগতিকদের।
সব দিক থেকে দক্ষিণ কোরিয়া শক্তিতে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে। এই দলের বিপক্ষে জয় তো দূরের কথা ড্র করতে পারলেও সেটি হবে আনন্দের উপলক্ষ, বড় প্রাপ্তি। বাংলাদেশ অধিনায়ক আশরাফুল ইসলাম সেই বাস্তবতা মেনেও নিয়েছেন। তার কাছে এই ম্যাচ অভিজ্ঞতা অর্জনের উপলক্ষ, ‘তারা শক্তিশালী দল। গত ম্যাচে তারা জাপানের সঙ্গে ড্র করেছে। তার আগে ভারতের সঙ্গে ড্র করে টুর্নামেন্ট শুরু করেছে। আমরা অনেকদিন পর আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলছি। ওদের ম্যাচের কিছু ভিডিও আমাদের কাছে আছে। এগুলো আমরা দেখব। সেগুলো দেখে পরিকল্পনা করব, ঠিক করব তাদের সঙ্গে কীভাবে খেলতে হবে।’
হকিতে দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের কাছে অচেনা প্রতিপক্ষ হলেও ভারত-পাকিস্তান একে অন্যের কাছে অনেক চেনা। নিজেদের এবং প্রতিপক্ষের শক্তি-সামর্থ্য সম্পর্কে তাদের জানাশোনা বেশ। তাই জুতসই পরিকল্পনা করেই মাঠে নামে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। যদিও লড়াইয়ের উত্তাপে রণকৌশলের পরিকল্পনা থেকে মানসিক চাপ সামাল দেওয়াই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বড় হয়ে ওঠে। এই চাপ সামলানোর ক্ষেত্রে ভারতই এগিয়ে। টুর্নামেন্টে দুই দলের আগের ৯ সাক্ষাতের পরিসংখ্যান সেটাই বলছে। জয়ের হিসেবে ৫-২ ব্যবধানে এগিয়ে ভারত। বাকি দুই ম্যাচের একটি হয়েছে ড্র, অন্যটি বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত। পরিত্যক্ত হওয়া ওই ম্যাচটি আবার ছিল সবশেষ আসরের ফাইনাল, যে কারণে এবারের আসরে দুই দল খেলছে যৌথ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে।
পরিসংখ্যান এগিয়ে রাখলেও পাকিস্তানের বিপক্ষে জয় পেতে নিজেদের সেরাটা দিয়ে খেলতে হবে বলেই মনে করছেন ভারতীয় কোচ গ্রাহাম রিড, ‘পাকিস্তানের হকির ইতিহাস দারুণ। তাদের বিপক্ষে সেরাটা দিয়েই খেলব, এই নিশ্চয়তা দিতে পারি।’ অধিনায়ক মানপ্রীত সিংও সেরাটা দেওয়ার অপেক্ষায়, ‘তারা নিজ দেশে ক্যাম্প করে ভালো প্রস্তুতি নিয়েছে। আমি আশা করি ভালো ম্যাচ হবে। আমরা সেরাটা দিয়েই খেলব।’ সেরাটা দিয়ে খেলার কথা বললেও অন্য ম্যাচগুলো থেকে আজকের ম্যাচটাকে আলাদাভাবে দেখতে চাইছেন না ভারতীয় অধিনায়ক।
মহারণের চাপ থেকে গা বাঁচাতে প্রতিপক্ষের মতো পাকিস্তানের অধিনায়ক ওমর ভুট্টোও বললেন, ‘এটা অন্য আর যেকোনো ম্যাচের মতোই। যখন আমরা কোনো ম্যাচ খেলি, সেখানে যে প্রতিপক্ষ থাকে, তাদের বিপক্ষে খেলতে হয়, এখানেও তাই।’
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের নিয়ে পাকিস্তান দলপতি আরও বললেন, ‘তারা সম্প্রতি অলিম্পিক খেলেছে, সেখানে ব্রোঞ্জ জয় করেছে। সুতরাং তারা ভালো দল। আমরা নিজেদের সেরাটাই তাদের বিপক্ষে দেওয়ার চেষ্টা করব। চেষ্টা করব তাই করতে, যা আমাদের করার কথা।’