ফারহানা ছাড়াও আরো শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মাথায় কাঁচি চালিছেন
নতুন সময় প্রতিনিধি
প্রকাশ: Sunday, 3 October, 2021, 2:31 PM
ফারহানা ছাড়াও আরো শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মাথায় কাঁচি চালিছেন
সম্প্রতি শিক্ষক ফারহানা ইয়াসমিন বাতেন কর্তৃক রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস সংস্কৃতি ও বাংলাদেশ স্টাডিজ বিভাগের ১৪ জন শিক্ষার্থীর মাথার চুল কেটে দেয়ার ঘটনায় বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র নাজমুল হোসেন তুহিন (২৫) ঘুমের ওষুধ সেবন করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পুরো ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সিসিটিভির ফুটেজে দেখা যায়, কাঁচি হাতে ফারহানা পরীক্ষার কক্ষের বারান্দায় অপেক্ষা করছেন। বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে এ সময় মাথায় চুল কেটে ফেলতেও দেখা যায়।
কিন্তু ফারহানা-ই প্রথম শিক্ষক নন যিনি শিক্ষার্থীদের চুল কেটে দিলেন। তিন বছর আগেই নারায়ণগঞ্জে নবম শ্রেণির দুই শিক্ষার্থীর চুল কেটে দেন তাদের এক 'শিক্ষক'। এছাড়া কিছুদিন পরপরই 'অদৃশ্য' ছুরি বা কাঁচি দিয়ে শিক্ষার্থীদের 'সম্মানবোধ' এ কাঁচি চালানোর খবর পাওয়া যায় গণমাধ্যম সূত্রে। তেমন কয়েকটি ঘটনাঃ
ডিসেম্বরের ১০ তারিখে নারায়ণগঞ্জে নিজেদের বাসা থেকে ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী উম্মে হাবিবা শ্রাবণীর (১৫) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। মৃত্যুর পর বাসায় তার হাতে লেখা একটি চিরকুট পাওয়া যায়।
ওই চিরকুট ও উম্মে হাবিবার পরিবারের বক্তব্য ছিল, সেদিন নিজ স্কুল গণবিদ্যা নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে গিয়েছিল উম্মে হাবিবা। পরীক্ষা চলাকালে নকল করার অভিযোগে শিক্ষক নাসরিন আক্তার তাকে ভর্ৎসনা করেন। আরেক শিক্ষক কামরুল হাসান তাকে চড় থাপ্পড় মারেন। পরে তাকে বহিষ্কার করা হয়। এ অপমান সইতে না পেরে উম্মে হাবিবা বাসায় ফিরে আত্মহত্যা করে।
শ্রাবণীর আত্মহত্যার ঘটনার সংবাদ প্রকাশিত হলে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ঘটনা তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিলে তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। এছাড়া ‘নকল’ করার যে অপবাদ নিয়ে শ্রাবণী আত্মহত্যা করেছিল, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তদন্তে তার কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। ঘটনার চারদিনে এ সত্য জানার পর সবাই ধারণা করেন, মিথ্যে অপবাদ সহ্য করতে না পেরেই আত্মহত্যা করেছে শ্রাবণী। এরপর শ্রাবণীর বাবা মো. হাবিবুল্লাহ বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় তার মেয়ের আত্মহত্যার ঘটনায় প্ররোচনার অভিযোগে ওই দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
ঘটনা-২ঃ ২০১৬ সালের ১৩ এপ্রিল। রাজধানীর উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের হাতে অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর নির্দয়ভাবে মার খাওয়ার ঘটনা ঘটে। শিক্ষক ওই শিক্ষার্থীকে ক্লাস থেকে ডেকে নিয়ে তার কানে ও মাথায় মারেন বলে অভিযোগ উঠে। এতে শিক্ষার্থীর কান থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ে। নির্যাতনের ঘটনায় ফুঁসে উঠেন অভিভাবকরা। দায়ী শিক্ষক জাউশেদ আলম নির্যাতনের বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি তখন বলেছিলেন, "ওই ছাত্রকে কয়েকটা চড়-থাপ্পড় দেয়া হয়েছে। এটা বড় কোনো বিষয় না।"
ঘটনা-৩ঃ ২০১৬ সালেই আরেক ঘটনায় স্কুল ছাড়ে রাজধানীর গুলশানের সি ব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ৫ম শ্রেণীর ছাত্রী তাজবিন রিহমা রশিদ (১০)। ১৭ এপ্রিল বিনা কারণে শিক্ষক শ্যামল বাবু স্কুল চলাকালীন সময়ে রিহমাকে মারধর (শরীরে আঘাত) করলে সে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। এ ব্যাপারে গুলশান থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন রিহমার বাবা জিএম হারুন-অর-রশিদ।
ঘটনা-৪ঃ ২০১৮ সালের ২৭ শে মার্চ। ঘটনাটি ঘটে নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুলে। ওইদিন চুল বড় রাখার অভিযোগে স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী কাশফি ও শান্তকে শারীরিক শাস্তির পাশাপাশি মাথার চুল কেটে দেন স্কুলটির শিক্ষক বিপুল সরকার। কয়েকশত শিক্ষার্থীর সামনে ক্লাসরুম থেকে ধরে এনে চুল কেটে দেওয়ার পর লজ্জায় অপমানে বিমর্ষ হয়ে পড়ে দুজনই।
ওই ঘটনাকে মধ্যযুগীয় ববর্রতা হিসেবে আখ্যায়িত করে দ্রুত ঐ শিক্ষকের শাস্তি দাবি করেন অভিভাবকরা। ঘটনার পর বেশ কিছুদিন স্কুল ছিল উত্তপ্ত।
নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থী কাশফির বাবা মো. রাসেল সে সময় সাংবাদিকদের বলেছিলেন, "আমরা অনেক আশা নিয়ে সন্তানদের স্কুলে পাঠাই। আমি মনে করতাম, মা-বাবার পরে সন্তানদের নিরাপদ স্থান হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আর সেই প্রতিষ্ঠানে এসে যদি এ ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে হয়, তাহলে কীভাবে ছেলেমেয়েরা পড়ালেখা করবে!"
ঘটনা-৫ঃ গেলো মাসেই লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে মাদ্রাসাশিক্ষক দ্বারা শিক্ষার্থীদের পায়ে শিকল পরিয়ে নির্যাতনের ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, রায়পুর-রামগঞ্জের সীমান্তবর্তী পানপাড়া বাজার দারুল কোরআন মহিলা মাদ্রাসায় গত ১১ সেপ্টেম্বর নাজেরা বিভাগের ছাত্র আরমানের পায়ে শিকল পরিয়ে সপ্তাহব্যাপী তার ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। এ ছাড়াও একই বিভাগের শিক্ষার্থী জাহিদ হোসেনকে দিয়ে ওই শিক্ষক (শহীদুল) তার শরীর 'ম্যাসেজ' করে নির্যাতন করেন। একপর্যায়ে বিষয়টি জানাজানি হলে অভিযুক্ত শহীদুল আরমান ও জাহিদের পরিবারের কাউকে বাইরে কোনো কথা না বলার জন্য সতর্ক করে দেন।
উল্লেখ্য, উপরোক্ত প্রতিটি ঘটনার বিবরণই গণমাধ্যম সূত্রে পাওয়া। গণমাধ্যমে প্রকাশ না পেলে কিংবা আলোচিত বা ফাঁস না হলে এমন অনেক ঘটনাই যে প্রতিনিয়ত চাপা পড়ে যায় সেটা বুঝা মুশকিল নয়।
প্রসঙ্গত, গেলো ১৩ মার্চ জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনা সভায় ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেছিলেন, “যেকোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বেত্রাঘাত করা বা কোনো ধরনের নির্যাতন সর্বোচ্চ আদালতের আইনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ। ইদানিং মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থী নির্যাতনের ভিডিও ইন্টারনেটে ভাইরাল হচ্ছে। যেকোনো ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই হোক, এটা আইনের লঙ্ঘন।”
স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রীর মুখ থেকে এমন কথা বেরুনোর পরও যখন সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী নির্যাতনের এমন সব ভয়াবহ ঘটনা সামনে আসছে, তখন বিষয়টি যে সংশ্লিষ্ট মহলের অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখবার সময় এসেছে তা বলাবাহুল্য।