মঙ্গলবার, ০৩ আগস্ট, 2০২1
নতুন সময় প্রতিবেদক
Published : Sunday, 11 July, 2021 at 2:53 PM, Update: 12.07.2021 6:45:23 PM
ইভ্যালিতে লোপাট ১০ হাজার কোটি: ধরা অনেক শীর্ষ ব্যবসায়ীও

ইভ্যালিতে লোপাট ১০ হাজার কোটি: ধরা অনেক শীর্ষ ব্যবসায়ীও

ইভ্যালির প্রকৃত দেনার পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বেপরোয়া ব্যবসার কারণে এই প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম শুরুর দেড় বছরের মাথায় ছয় হাজার কোটি টাকা দেনার মুখোমুখি হয়। এর পর গত এক বছরে সাধারণ গ্রাহক ও কর্পোরেট পর্যায়ে তাদের সর্বমোট দেনা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। ব্যক্তিস্বার্থ ও অর্থ সাশ্রয়ের প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে টাকা লোপাট করাই এ প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য বলে অভিযোগ উঠেছে। 

সূত্র জানায়, গত আড়াই বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি ই-কমার্সভিত্তিক ব্যবসা পরিচালনা করছে। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা দামি ব্র্যান্ডের 'রেঞ্জ রোভার', 'পোরশে', 'অডি' গাড়ি চালাচ্ছেন। বিলাসী তাদের জীবনযাপন। প্রতারণার মাধ্যমে মানুষের চোখে ধুলো দিয়ে তারা অর্থ-সম্পদ গড়ে তুলেছেন। তাদের বিরুদ্ধে দুবাইতে অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে। ইভ্যালির এমডি ও সিইও মো. রাসেল এবং তার স্ত্রী প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন একে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন।

অন্যদিকে ইভ্যালিতে বড় অঙ্কের অর্থ লগ্নি করে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন রাজধানীর স্টেডিয়াম মার্কেটের টেলিভিশন ব্যবসায়ী সোহেল হাসান। একসময় বিভিন্ন কম্পানির সঙ্গে ব্যবসা করতেন। লাভ হতো কমিশন হারে। কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে ঝুঁকে পড়েন ইভ্যালিতে। প্রথম দিকে প্রতি ক্রয়াদেশে পাঁচ থেকে ১০টি টেলিভিশন ছিল। আগের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ কম দামে কিনে বেচতেন বাজারদরে। লাভ হতো অনেক। অবস্থা বুঝে তিনি শতভাগ ইভ্যালিনির্ভর হয়ে যান। কোপা আমেরিকা ও ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ খেলাকে কেন্দ্র করে বাজারে চাহিদা বাড়বে—এ ধারণায় গত এপ্রিলে বিশাল অঙ্কের ছাড়ে প্রায় ২০০টি টেলিভিশন অর্ডার দেন। অগ্রিম প্রায় ৫০ লাখ টাকা জমাও দেন। জুনের প্রথম সপ্তাহে টেলিভিশন পাওয়ার কথা; এখনো পাননি। আটকে আছে লগ্নি করা টাকাও। অনেকবার যোগাযোগ করেও এর সমাধান পাননি সোহেল। এর মধ্যে ইভ্যালিতে আরো অনেকের টাকা আটকে থাকার খবর শুনে সোহেলের ঘুমই হারাম।

প্রায় একইভাবে ইভ্যালির ফাঁদে পড়া অন্তত দুই ডজন শীর্ষ ব্যবসায়ীর পাওনা প্রায় দেড় শ কোটি টাকা। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক থেকে সদস্যরাও। নিজেদের পাওনা টাকা আদায়ে তাঁরা কয়েক দিন ধরে ইভ্যালির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে গোপনে বৈঠক করে যাচ্ছেন। সর্বশেষ গতকাল শনিবার দুপুরেও ইভ্যালির ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে বসেছিলেন শীর্ষ ব্যবসায়ীরা। তবে কোনো রকম ইতিবাচক ফল ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়েছে।

গতকালের বৈঠকে অংশ নেওয়া শীর্ষ এক ব্যবসায়ী ও এফবিসিসিআই পরিচালক নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, ‘ইভ্যালির কাছে পাওনা ও বিনিয়োগের বড় অংশই হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। ইভ্যালিতে শুধু গ্রাহকই নয়, আমরা অনেক ব্যবসায়ীও প্রতারিত হয়েছি। ক্ষতিগ্রস্তও হচ্ছি আমরা বেশি। কয়েক দিন ধরে আমরা দফায় দফায় বৈঠক করছি। কিন্তু যাদের থেকে পণ্য কিনেছে তাদের টাকা, আবার যাদের থেকে টাকা নিয়েছে পণ্য দেবে বলে কোনোটাই করতে পারছে না ইভ্যালি। আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’

জানা গেছে, ইভ্যালি শীর্ষ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পণ্য কিনে গ্রাহকদের সরবরাহ করত। ব্যবসায়ীদের থেকে পণ্য কিনতে গিয়ে ধীরে ধীরে বিপুল অঙ্কের বকেয়া পড়ে গেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যবসায়ী ইভ্যালির নানা লোভনীয় অফারে আকৃষ্ট হয়ে নির্দিষ্ট সময় পরে কম দামে পণ্য পেতে বিনিয়োগ করে রেখেছে। এই বিনিয়োগ টেলিভিশন ও মোটরসাইকেল খাতে সবচেয়ে বেশি।

সূত্র জানায়, আকর্ষণীয় অফার দিয়ে কম মূল্যে পণ্য বিক্রির নামে সারাদেশের লাখ লাখ গ্রাহকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে অর্থ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক তদন্ত প্রতিবেদনে ব্যক্তি ও মার্চেন্ট পর্যায়ের গ্রাহকদের কাছে ইভ্যালির দেনার পমিাণ ৩৩৮ কোটি টাকা। এ অর্থ আত্মসাৎ করে তাদের ব্যাংক হিসাব থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে মোট দেনার পরিমান ১০ হাজার কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে জানা গেছে।  

অ্যামাজন বাংলাদেশ লিমিটেডের চেয়ারম্যান আমান উল্লাহ চৌধুরী নতুন সময়কে বলেন, ইভ্যালির গ্রাহক অফার, গ্রাহকদের পণ্য সরবরাহ, ব্যাংক লেনদেন, ইভ্যালির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব নিরপেক্ষ একটি অডিট টিম দিয়ে তদন্ত করা হলে অস্বাভাবিক দেনা ছাড়াও অজানা অনেক কাহিনি বেরিয়ে আসবে।

এ ব্যাপারে ইভ্যালির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাসেলের দুটি নম্বরে কল করলে সেগুলো বন্ধ পাওয়া যায়।

জানা গেছে, ইভ্যালি ই-কমার্স ব্যবসার জন্য নিবন্ধন গ্রহণ করে ২০১৮ সালের ১৪ মে। আনুষ্ঠানিক ব্যবসা শুরু করে একই বছরের ডিসেম্বরে। শুরুতেই তারা নানা ধরনের পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে আকর্ষণীয় অফার দিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গ্রাহদের আকৃষ্ট করে। বাজারের চেয়ে অস্বাভাবিক কম মূল্যে পণ্য বিক্রির একের পর এক অফার দিতে থাকে তারা। কিছু গ্রাহককে বড় অংকের ডিসকাউন্ট দিয়ে পণ্য সরবরাহ করে প্রচার চালানো হতো। দু'শ থেকে তিনশ পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট অফারও ছিল তাদের। এ ধরনের অফারে গ্রাহক বিনামূল্যে অতিরিক্ত পণ্যও পেয়েছে। এতে গ্রাহকসাধারণের মধ্যে ইভ্যালির পণ্য কেনার ক্ষেত্রে দারুণ মোহ সৃষ্টি হয়। কম দামে আগে পণ্য কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে বুকিং দিয়েছেন গ্রাহকরা।

ইভ্যালির ব্যবসায় জড়িত একটি সূত্র জানায়, মোটরসাইকেল বিক্রির অফারে এক হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে একশ জনের মধ্যে সরবরাহ করা হতো। বাকি ৯০০ গ্রাহককে দিই-দিচ্ছি বলে সময় ক্ষেপণ করা হতো। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, ওই এক হাজার জনের কাছ থেকে ইভ্যালি দুই লাখ টাকা মূল্যের প্রতিটি বাইকের দাম নিয়েছে এক লাখ টাকা। তাতে এক হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় হয় ১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যবসার কৌশল হিসেবে একশ গ্রাহককে বাইক সরবরাহ করা হয়। এই হিসাব অনুযায়ী একশ বাইকের দাম হয় এক কোটি ৮০ লাখ টাকা। বাকি ৯০০ গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া ৮ কোটি ২০ লাখ টাকা ইভ্যালির অ্যাকাউন্টে থেকে যেত। ইভ্যালির কর্ণধারদের আখের গোছাতে ভোগ-বিলাসে খরচ করা হতো এই টাকা।

এর পর আরও আকর্ষণীয় অফার প্রচার করা হতো। এ অফার থেকে একইভাবে গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া হতো মোটা অংকের টাকা। এ অফার থেকে কোটি কোটি টাকা আদায় করে আগের অফারে বঞ্চিত খুবই সামান্যসংখ্যক গ্রাকককে পণ্য দেওয়া হতো। চলমান অফারে বঞ্চিত হতো সিংহভাগ গ্রাহক। এভাবেই গ্রাহককে বঞ্চিত করে অর্থের পাহাড় গড়ে তুলেছেন ইভ্যালির কর্ণধাররা। বর্তমানে ইভ্যালির গ্রাহকসংখ্যা কম-বেশি ৭০ লাখ বলে জানা গেছে।

ইভ্যালি-সংশ্নিষ্ট একটি সূত্র জানায়, গত বছর জুলাইতে এ প্রতিষ্ঠানের দেনার পরিমাণ ছিল ছয় হাজার কোটি টাকা। বর্তমান সময়ে এই দেনা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকায়।

ইভ্যালির বিরুদ্ধে গ্রাহক প্রতারণার প্রথম অভিযোগ করেন অ্যামাজন বাংলাদেশ লিমিটেডের চেয়ারম্যান আমান উল্লাহ চৌধুরী। তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ব্যাংক, এনএসআইসহ সরকারের সাতটি প্রতিষ্ঠানে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছিলেন। এর পরই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক ইভ্যালির ওপর নজরদারি শুরু করে। আলাদা তদন্তে তারা গ্রাহক প্রতারণা ও গ্রাহকের অর্থ তছরুপের প্রমাণ পায়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত বছরের শেষদিকে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন দুদকে পাঠায়। দুদক তখন অভিযোগটির প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করে। পরে মন্ত্রণালয় গত ৭ জুলাই আরেকটি তদন্ত প্রতিবেদন পাঠায় দুদকে। এর পর দুদক অভিযোগটির অনুসন্ধান জোরদার করে। বাংলালাদেশ ব্যাংক থেকেও ইভ্যালির প্রতারণা সংক্রান্ত কিছু নথি দুদকে পাঠানো হয়।

গ্রাহক প্রতারণার দায়ে বাংলাদেশ ব্যাংক গত বছর আগস্টে ইভ্যালির ব্যাংক লেনদেন বন্ধ করে দেয়। পরে ইভ্যালির কর্ণধাররা নানা পর্যায়ে তদবির করে শর্তসাপেক্ষে ব্যাংক লেনদেন চালুর ব্যবস্থা করেন। এ শর্তে গ্রাহকদের জন্য অস্বাভাবিক অফার না দেওয়াসহ অন্যান্য শর্ত ছিল।

একাধিক ই-কমার্স বিশেষজ্ঞ বলেন, বিপুল অর্থ ছাড় দিয়ে পণ্য বিক্রির ফলে ই-কমার্স ব্যবসায় অসুস্থ প্রতিযোগিতা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। এতে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এ প্রক্রিয়া অনুসরণে উৎসাহিত হতে পারে। এর ফলে আগামী দিনে অন্যান্য ই-কমার্স ব্যবসায়ীর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড চলতে থাকলে উদীয়মান এ খাতের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাবে। তারা আরও বলেন, একটি নিরপেক্ষ অডিট টিম দিয়ে ইভ্যালির আর্থিক অনিয়ম তদন্ত করা হলে তাদের প্রতারণা, অনিয়ম, দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে।

ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সভাপতি শমী কায়সার বলেন, ‘ইভ্যালির ব্যবসা শুরুই হয়েছিল মিসম্যানেজমেন্ট দিয়ে। এত বড় আকারের ব্যবসা করতে হলে একটি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্ট মার্কেটিং, মার্কেট স্ট্যাটিস্টিকস, বিজনেসসহ সব বিভাগে যে সেটআপ থাকার কথা সেটা ইভ্যালিতে আমরা পাইনি। ভোক্তারা ই-কমার্স বিজনেসের ক্ষেত্রে ঠকে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ জন্য দেশে আইনও আছে। ইভ্যালি সে আইন না মেনেই ব্যবসা করেছে।’ তিনি বলেন, এখন ইভ্যালি যে অবস্থায় চলে গেছে, তাতে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে ভোক্তাদের টাকা ফেরত দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। যদিও এ ক্ষেত্রে টাকা কতটুকু পাওয়া যাবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা আছে।’ অফারের ফাঁদে পা না দেওয়ার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নিজেকে ঝুঁকিতে ফেলবেন না। দেশে ই-কমার্স ব্যবসায় আইন আছে। আইনের বাইরে গিয়ে যারা ব্যবসা করবে, সেখানে ঝুঁকিও থাকবে, এটি মাথায় রাখা উচিত।’

দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইভ্যালির এমডি ও সিইও মো. রাসেল এবং চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনের বিরুদ্ধে আদালত থেকে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।


পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত


DMCA.com Protection Status
সম্পাদক ও প্রকাশক: নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, বাড়ি ৭/১, রোড ১, পল্লবী, মিরপুর ১২, ঢাকা- ১২১৬
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
Developed & Maintainance by i2soft