বাংলাদেশে অনেক ছোট দলই এখন ছোট হতে হতে অন্তরালে চলে গেছে। একসময় এসব ছোট দল বড় ছিলো। ভেঙে দ্বিখণ্ডিত, দ্বিখণ্ডিত আবার দ্বিখণ্ডিত… এভাবেই অনেক দল এখন ব্র্যাকেটবন্দি হয়ে আছে। কিন্তু কেউই ব্র্যাকেট ছেড়ে বের হতে চায় না। কারণ শত হলেও তো দলীয় প্রধান! আবার দলীয় প্রধান হলে আরেক দলীয় প্রধানের সঙ্গে বসা যায়, স্ট্যাটাস মাপা যায়, নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে দেনদরবার করা যায়, গণমাধ্যমে কখনো কখনো গুরুত্ব পাওয়া যায়। এমন সাধের পরিচিতি কেউ হারাতে চায় কী? জানি না জাতীয় পার্টি সেই লাইন ধরছে কিনা? তবে অতীতে ডা. মালেক জাতীয় পার্টি, জাফর জাতীয় পার্টি, মঞ্জু জাতীয় পার্টি, জেপি জাতীয় পার্টি ইত্যাদি নামে যা দেখা যায় তারা একসময় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে ছিলেন। সময়টি অবশ্যই এরশাদ সাহেব যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখনকার বলা যায়। এই ব্র্যাকেটবন্দি জাতীয় পার্টিগুলো এখন সামান্যই অস্তিত্ব নিয়ে টিকে আছে। তবে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যতোদিন জীবিত ছিলেন তিনি জাতীয় পার্টির মূল অংশকে টিকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। এর অনেক কারণ আছে।
অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে ১৯৯০ সালে এরশাদ সাহেবকে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হলেও বিস্ময়করভাবে ১৯৯১ এর নির্বাচনে তিনি নিজে ৫টি আসনে জয়লাভ করেন এবং দলকে সংসদের তৃতীয় বৃহত্তম দলের মর্যাদা দিতে পেরেছিলেন। এটি তিনি নিজে কতোটা পেরেছিলেন জানি না তবে আমাদের ভোটারদের একটা বড় অংশ তাকে এমন বিজয়ের মালা পরিয়েছিলেন। অথচ এই এরশাদই ১৯৮৬ এবং ১৯৮৮ সালে সংসদ নির্বাচন করতে গিয়ে জনগণের তোপের মুখে কীভাবে পড়েছিলেন সেটি ভোলার কথা নয়। ক্ষমতা থেকে পতিত হওয়ার পর এরশাদ তার জাতীয় পার্টিকে সবসময়ই সংসদে রাখার মতো করে রাজনীতি করেছেন। ফলে গত প্রায় তিনদশক ধরে এরশাদের জাতীয় পার্টি ক্ষমতার খুব কাছাকাছি থেকেছে। গতবার তিনি মহাজোটের অংশীদার হয়ে সরকারেও ছিলেন, বিরোধী দলেও ছিলেন। একাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি বিরোধীদলীয় নেতার অবস্থানে দলকে বিজয়ী করে আনতে পেরেছিলেন। জাতীয় পার্টির আসন এই সংসদে ২৬টি। সম্প্রতি তার মৃত্যুতে জাতীয় পার্টি এরশাদবিহীনভাবে কীভাবে চলবে সেটি একটি মস্তবড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। তার জীবিত অবস্থাতেও দলের শীর্ষ পদ নিয়ে নানা পরিস্থিতি তৈরি হতো। বিশেষত তার স্ত্রী বেগম রওশন এরশাদ এবং তার ছোট ভাই জিএম কাদেরের পদ-পদবি বণ্টন নিয়ে প্রায়ই এরশাদ সাহেবকে এসব পদে ঘনঘন পরিবর্তন করতে হতো। সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা, উপনেতা ইত্যাদি পদেও তাকে আচমকা পরিবর্তনের নজির সৃষ্টি করতে দেখা গেছে। অবশ্য দলের মহাসচিব পদ নিয়েও প্রায়ই পরিবর্তনের নাটক মঞ্চস্থ হতো, আবার সে নাটক ভেঙেও যেতো। এরশাদ সাহেব সত্যি কিছু মানুষকে পেয়েছিলেন যাদের তিনি কখনো রাখতেন আবার অন্য পদে সরিয়ে দিতেন। কিন্তু তারা তেমন কেউই এরশাদকে ছাড়তেন না। বরং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে পল্লীবন্ধু পল্লীবন্ধু বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলতেন। অবশ্য আমাদের দেশে রাজনীতিতে এখন নেতাদের নামের সঙ্গে এমন সব বিশেষণ ঘনঘন উচ্চারিত হয় যার ফলে বঙ্গবন্ধুর মতো রাজনৈতিক নেতাদের প্রাপ্ত উপাধিও যেন সমান্তরাল করার চেষ্টা করা হয়।
এরশাদ সাহেব এখন নেই। কিন্তু তার দল এরই মধ্যে দুই সভাপতির দ্বন্দ্বে দ্বিখণ্ডিত হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে পড়েছে। একদিকে জীবিত থাকাকালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তার ছোট ভাই জিএম কাদেরকে দলের ভবিষ্যৎ চেয়ারম্যান নিযুক্ত করে যাওয়ার পরও এখন তার স্ত্রী বেগম রওশন এরশাদকে নিয়ে দলের আরেকটি অংশ মাঠে নেমেছেন। তারা রওশন এরশাদকে দলের সভাপতি এবং সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার পদটি ধরে রাখার জন্য মাঠে নেমেছে। এখানে এই দুজনের কে দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী হয়েছেন, নাকি হননি সেই বিবেচনাটি দলের অনেকেই বোধহয় মেনে নিচ্ছেন না। কারণ দলে নিজেদের পদ-পদবি রক্ষার মধ্য দিয়ে স্বার্থ ধরে রাখার একটি প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এই প্রতিযোগিতার মধ্যে আদর্শের বালাই কতোটা আছে বলা মুশকিল। জাতীয় পার্টির আদর্শ আসলে কী সেটি অনেকের কাছে মস্তবড় জিসার বিষয়। তবে এসব জিজ্ঞাসার উত্তরে বোদ্ধারা বলেন, স্বার্থসিদ্ধি ছাড়া আর তো তেমন কিছু দেখা যায় না। বিএনপির আদর্শ সবাই জানে। দলটি আওয়ামীবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল ভাবাদর্শের লোকদের আশ্রয় দিয়ে গড়ে উঠেছে। যদিও বলা হয়ে থাকে এর আদর্শ হচ্ছে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় মূল্যবোধ ইত্যাদি। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে দেশের নাগরিকদের নিয়ে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে’র তত্ত্ব জিয়াউর রহমান দিলেও সেটি আসলেই দ্বিজাতি তত্ত্বের নামান্তর মাত্র। বিএনপি ধর্মের আদর্শের চর্চার চাইতে রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহার বরাবরই করে এসেছে। সেটি মসজিদে উলুধ্বনি, ধর্ম চলে যাবে, হিন্দু হয়ে যাবে ইত্যাদি মুখরোচক কথার মধ্যেই প্রমাণ পাওয়া যায়। এরশাদ সাহেবও ক্ষমতায় এসে বিএনপির আদর্শ অনুসরণে জাতীয় পার্টি গঠন করেছিলেন। তার দলে তখন বিএনপি ছেড়ে অনেকেই স্থান করে নিয়েছিলো।
আবার তাদের অনেকেই ১৯৯১-এর পর বিএনপিতে ফিরে গেছে। জাতীয় পার্টি মনে করেছিলো তাদের দলটি বিএনপির বিকল্প দল হবে। কিন্তু এরশাদ সাহেব জীবিত থাকাকালে কখনোই দলের আদর্শ নিয়ে মাথা ঘামাননি গলাবাজিও করেননি। তবে ক্ষমতায় যাওয়া, থাকা বা অংশীদার হওয়ার চেষ্টা নিরন্তর করে গেছেন। সেভাবেই তিনি রাজনীতি করেছেন। জাতীয় পার্টি অন্য কোনো আদর্শ বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে বলে খুব একটা প্রমাণ পাওয়া যায় না। এখন এরশাদ সাহেব বেঁচে নেই। যাদের তিনি রেখে গেছেন তারা মুখে যতোই বলেন এরশাদের আদর্শ তারা অনুসরণ করবেন, কিন্তু এরশাদ নিজেই তো রাজনীতির কোনো আদর্শ ধরে থাকেননি। তাহলে এখন যারা এরশাদের নামে ভেলা ভাসিয়েছেন তাদের যাত্রা কতোদূর, কী অবলম্বন করে হবে সেটিই তো মস্তবড় জিজ্ঞাসার বিষয়। আসলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন আর বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল, অধ্যাপক মোজাফফর আহম্মদ, মণি সিং ফরহাদদের মতো রাজনৈতিক নেতা বেড়ে উঠেননি। সে কারণে দলও সেভাবে আদর্শভিত্তিক অবস্থানে বেড়ে উঠছে না।
শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধরে গত চার দশক ধরে রাজনীতি করছেন, দেশ শাসন করছেন, নিজেকে তিনি একজন দক্ষ, মেধাবী, উদ্ভাবনশীল, বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কিন্তু তার দলের কতোজন এভাবে রাজনীতি করছেন সেটি নিয়ে প্রশ্ন অনেকের মধ্যেই আছে। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোতে যারা আছেন তারা রাজনীতির আদর্শ পুরুষ বলে কেউ সনদপত্র পাবেন এটি বলা খুব কঠিন। বাংলাদেশে অসংখ্য ব্র্যাকেটবন্দি রাজনৈতিক দল আছে। কিন্তু দেশকে সত্যিকার অর্থে নেতৃত্ব দেয়ার মতো নেতা কোথায়? জাপা থেকে এখন যারা বের হওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন কিংবা জাপা ভেঙে হলেও দলের প্রধান থাকবেন তারাও ওই একই শ্রেণিভুক্ত নেতা হতে যাচ্ছেন কিনা সেটি বোধহয় দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাপা এক থাকবে নাকি আবার আরেক জাপার জন্ম দেবে সেটি দলটির নেতারাই ঠিক করবেন। আমরা শুধু বলতে পারি তাতে দেশের রাজনীতির কোনো যোগ-বিয়োগ হবে না। এটিই বাস্তব সত্য। লেখক : শিক্ষাবিদ