|
১৮ টাকায় কেনা বায়োস্কোপে ৫০ বছর কেটে গেল সর্বানন্দের
নতুন সময় প্রতিনিধি
|
![]() ১৮ টাকায় কেনা বায়োস্কোপে ৫০ বছর কেটে গেল সর্বানন্দের আধুনিক প্রযুক্তির ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য ‘বায়োস্কোপ’ আজও আগলে রেখেছেন বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার প্রবীণ শিল্পী সর্বানন্দ মধু। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার বয়স ৮১ বছর। উপজেলার বাগদা গ্রামের এই মানুষটি টানা পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে কাঁধে বায়োস্কোপের বাক্স নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, গ্রাম ও মেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। শুধু একটি লোকজ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতেই নয়, এই বায়োস্কোপই তার পরিবারের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। একসময় দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতায় নিজের পড়ার বই বিক্রি করে চাল কিনে খেতে হয়েছে তাকে। সেই মানুষটিই পরে বায়োস্কোপ দেখিয়ে ভাই-বোনদের লেখাপড়া করিয়েছেন। নিজের সন্তানদের মানুষ করেছেন, এমনকি কিনেছেন জমিজমাও। জীবনের দীর্ঘ পথচলায় বায়োস্কোপই হয়ে উঠেছে তার সবচেয়ে বড় সম্পদ। ১৮ টাকার বায়োস্কোপ বদলে দিল জীবন সর্বানন্দ মধু পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে মেজ। বাবা ছিলেন কাঠমিস্ত্রি। সংসারের অভাবের কারণে স্কুলের গণ্ডি পেরোনো হয়নি। ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে কাঠমিস্ত্রির কাজ শিখে জীবিকার পথে নামতে হয়। প্রায় ৫০ বছর আগে যশোরের বেনাপোলে কাঠমিস্ত্রির কাজ করতে গিয়ে এক ব্যক্তির কাছ থেকে মাত্র ১৮ টাকায় একটি পুরোনো বায়োস্কোপ কিনে নেন। নিজের ভালোবাসা দিয়ে নাম দেন ‘কায়দার কায়দা বায়োস্কোপ’। এরপর শুরু হয় নতুন এক জীবন। এক হাতে ডুগডুগি, অন্য হাতে বায়োস্কোপের হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে ছন্দময় ভাষায় মানুষকে ডাকতেন। তার সেই অভিনব উপস্থাপনায় মুগ্ধ হয়ে শিশু-কিশোররা দল বেঁধে ছুটে আসত। অনেকটা হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার গল্পের মতো। এক মুঠো চাল থেকে ১০ টাকার টিকিট প্রথম দিকে পাঁচ কিংবা ১০ পয়সা, কখনো এক মুঠো চালের বিনিময়ে বায়োস্কোপ দেখাতেন সর্বানন্দ। বাক্সের ভেতরে থাকতো মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় পতাকা, ঐতিহাসিক স্থাপনা, বিশ্বের বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান, পশুপাখি ও শিক্ষামূলক নানা ছবির সমাহার। বর্তমানে একজন দর্শকের কাছ থেকে ১০ টাকা নেন তিনি। বিভিন্ন মেলা ও অনুষ্ঠানে দিনে ১০০০-১২০০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। যদিও আগের মতো দর্শক আর নেই, তবুও মানুষের ভালোবাসাই তাকে এখনো পথে রাখে। বাক্সে বন্দি ইতিহাস লাল রঙের কাঠের বাক্সটির সামনে রয়েছে কয়েকটি চোঙার মতো লেন্স। ভেতরে কাপড়ের সঙ্গে সাজানো থাকে ধারাবাহিক ছবি। পাশের হ্যান্ডেল ঘোরালে ছবিগুলো একের পর এক সামনে আসে। আর সেই ছবির সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে গল্প বলেন সর্বানন্দ। মুহূর্তেই দর্শক চলে যায় অন্য এক জগতে। আগৈলঝাড়ার বাসিন্দা আবুল কালাম হাওলাদার বলেন, ‘আমরা ছোটবেলায় তার বায়োস্কোপ দেখে বড় হয়েছি। এখন আমাদের সন্তানদেরও দেখাই। এটা শুধু বিনোদন নয়, আমাদের শৈশবের স্মৃতি।’ স্থানীয় কলেজশিক্ষক সুমন কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘সর্বানন্দ মধু একজন জীবন্ত লোকসংস্কৃতি বহনকারী মানুষ। তার মতো শিল্পীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া দরকার। তা নাহলে এই শিল্প একদিন ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।’ ‘মানুষ আনন্দ পেলে ভালো লাগে’ সর্বানন্দ মধু বলেন, ‘জীবনে অনেক কষ্ট করেছি। বই বিক্রি করে চাল কিনে খেয়েছি। তখন ভাবিনি এই বায়োস্কোপই একদিন আমার পরিচয় হবে। এই বায়োস্কোপ দেখিয়েই ভাই-বোনদের পড়িয়েছি, ছেলে-মেয়েদের মানুষ করেছি। এখন বয়স হয়েছে, শরীর আগের মতো চলে না। তবুও মানুষ ডাকলে চলে যাই। মানুষ আনন্দ পেলে আমারও ভালো লাগে।’ তবে ভালো লাগার পাশাপাশি আক্ষেপও রয়েছে এই শিল্পীর। তিনি করে বলেন, ‘মোবাইল আর ইন্টারনেটের যুগে বায়োস্কোপের কদর কমেছে। কিন্তু গ্রামের মানুষ এখনো ভালোবেসে দেখে। আমি চাই, এই ঐতিহ্য যেন আমার সঙ্গে হারিয়ে না যায়।’ লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, বায়োস্কোপ একসময় গ্রামীণ জনপদের অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদন ছিল। কিন্তু প্রযুক্তির বিস্তারে এটি প্রায় বিলুপ্ত। এমন পরিস্থিতিতে সর্বানন্দ মধুর মতো শিল্পীরা কেবল একজন প্রদর্শক নন, তারা বাংলাদেশের লোকঐতিহ্যের জীবন্ত সংগ্রহশালা। বরিশাল চারুকলার সংগঠক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সুশান্ত ঘোষ বলেন, ‘দেশ দ্রুত বদলাচ্ছে, বিনোদনের ধরনও পাল্টে গেছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের মাঝেও কাঁধে বায়োস্কোপের বাক্স ঝুলিয়ে, ডুগডুগি বাজিয়ে পথ হাঁটেন সর্বানন্দ। তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন মনে করিয়ে দেয় ঐতিহ্য কখনো শুধু জাদুঘরে বাঁচে না; বেঁচে থাকে মানুষের ভালোবাসায়, স্মৃতিতে এবং কিছু নিবেদিতপ্রাণ মানুষের হাত ধরে।’ এ বিষয়ে আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিরুপম মজুমদার বলেন, ‘ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে সরকারিভাবে যদি কিছু করা যায় করবো। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা করা হবে।’ |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
