কালের গহ্বরে হারিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় ২০২১। ক্রীড়াঙ্গনের সাফল্য-ব্যর্থতা, আনন্দ-বেদনা সর্বোপরি কত শত উপাখ্যান জড়িয়ে আছে বিদায় নিতে যাওয়া বছরটিতে। সময়ের আলোর পাঠকদের সঙ্গে সেগুলো ভাগাভাগি করতেই আমাদের এই প্রয়াস। ধারাবাহিক বর্ষপরিক্রমার শুরুতেই আজ থাকছে দেশের ক্রিকেট
নিয়ম মেনেই চার বছর পর (৬ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত হয়েছে বিসিবি নির্বাচন। সেই নির্বাচন অবশ্য দেশের ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থাটির পরিচালনা পর্ষদে তেমন কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। আগের দুবারের মতো এবারও সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন নাজমুল হাসান এবং তার সমর্থন পাওয়া সংগঠকরাই নির্বাচিত হয়ে পরিচালক বনে গেছেন। অর্থাৎ ছকে বাঁধা নীতিতেই চলছে বিসিবি, মাঠের ক্রিকেটে টিম বাংলাদেশও। বিগত বছরগুলোর মতো এবারও ওয়ানডেতে আলো ছড়িয়েছে টাইগাররা, আবার হাবুডুবু খেয়েছে টেস্ট আর টি-টোয়েন্টিতে। তবে তিন সংস্করণ মিলিয়ে এ বছর ৬টি সিরিজ জিতেছে বাংলাদেশ, অতীতে কোনো বছরই এত সিরিজ জেতা হয়নি (২০০৯ আর ২০১৮ সালে ৫টি করে সিরিজ জয়)। কিন্তু বছরের শেষদিকে এতটাই মলিন ছিল টাইগাররা, সাফল্য ছাপিয়ে সেটাই যেন বড় হয়ে উঠেছে।
মরুর বুকে এ বছর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে যেভাবে ব্যর্থ হয়েছে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের দল, তা ছাড়িয়ে গেছে স্মরণকালের সব ব্যর্থতাকেই। আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে বিস্তর। জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন বিতর্ক। বিতর্কের আগুনে বিসিবির শীর্ষ কর্তারা যেমন, তেমনিভাবে ঘি ঢেলেছেন মুশফিক-মাহমুদউল্লাহর মতো সিনিয়র ক্রিকেটাররাও। সবমিলেই নড়বড়ে হয়ে গেছে প্রধান কোচ রাসেল ডমিঙ্গোর চেয়ার, প্রধান নির্বাচকের দায়িত্ব হারাতে চলেছেন মিনহাজুল আবেদীন নান্নু। সার্বিক পরিস্থিতি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে- রূপান্তরকাল চলছে বাংলাদেশের ক্রিকেটে। এই করোনাকালে মেয়েদের ক্রিকেটে একটা রূপান্তর ইতোমধ্যে হয়েও গেছে, বাছাইপর্ব টপকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে টাইগ্রেসরা। এর থেকেও বড় খবর- এ বছরের এপ্রিলে টেস্ট মর্যাদা পেয়েছে তারা।
নারী ক্রিকেটের এমন সুসময়েই ছেলেরা মান। বছরের শেষপ্রান্তে নিজেদের নামের প্রতি অবিচারই করেছে টাইগাররা। টেস্টে আশার প্রদীপ জ্বেলেও তা বারবার নিভিয়ে দিয়েছে মুমিনুল ব্রিগেড। ৭ টেস্ট খেলে ৫টিতেই হার, একটি করে ড্র (এপ্রিলে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পাল্লেকেলেতে) আর জয়ই (জুলাইয়ে হারারেতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২২০ রানে) এই সংস্করণে এ বছর বাংলাদেশের প্রাপ্তি। পরিসংখ্যানটা অবশ্য আরও সমৃদ্ধই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বছরের শুরুতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট দুটো অবিশ্বাস্যভাবে জিততে জিততে হেরেছে মুমিনুল হকের দল। বছর শেষে তাই ৪৭ রেটিং নিয়ে র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান নবম, আটে থাকা ওয়েস্ট ইন্ডিজের থেকে ২৮ রেটিং কম তাদের। এর থেকেও বড় বিষয় হচ্ছে- ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম চক্র পয়েন্টহীনভাবে শেষ করার পর দ্বিতীয় চক্রেও পয়েন্টহীন থেকে বছর শেষ করতে হচ্ছে টাইগারদের।
টেস্টের থেকেও করুণ দশা টি-টোয়েন্টিতে। অস্ট্রেলিয়ায় আগামী বছর হতে যাওয়া পরবর্তী বিশ্বকাপে সরাসরি অংশগ্রহণের টিকেট নিশ্চিত করলেও এই সংস্করণে বছরটা দশম স্থানে থেকে শেষ করতে হচ্ছে টাইগারদের। এ বছর ২৭ ম্যাচ খেলে মাহমুদউল্লাহর দল জয় পেয়েছে ১১টি। অতীতে নির্দিষ্ট কোনো বছরে এত জয় অবশ্য পায়নি বাংলাদেশ, ক্রিকেটের এই ক্ষুদ্র সংস্করণে এতগুলো ম্যাচও খেলার সুযোগ হয়নি আগের কোনো বছরে। ইতিহাস গড়ে ঘরের মাঠে এ বছরই অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডকে প্রথমবার হারানোর মধুর স্বাদ নিয়েছে টাইগাররা। ওই পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু এর পরের সময়টা, নির্দিষ্ট করে বললে বছরের শেষভাগের অভিজ্ঞতা ভুলে যাওয়ার মতোই।
অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডকে হারানোর আনন্দ নিয়ে অক্টোবর-নভেম্বরে মধ্যপ্রাচ্যে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে যায় মাহমুদউল্লাহর দল। সেখানে শুরুর ম্যাচেই ধাক্কা, হার স্কটল্যান্ডের কাছে। পরের দুই ম্যাচে স্বাগতিক ওমান আর পাপুয়া নিউগিনিকে হারিয়ে কোনোমতে বাছাইপর্বের গণ্ডি পেরিয়ে আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত মূলপর্ব তথা সুপার টুয়েলভে নাম লেখালেও কোনো ম্যাচ জিততে পারেনি টাইগাররা। টানা পাঁচ ম্যাচ হেরে মরুর দেশ থেকে সবার আগেই ঘরে ফেরে মাহমুদউল্লাহর দল। এরপর পাকিস্তানের বিপক্ষে হোম সিরিজেও তাদের ভাগ্যের শিকে ছিঁড়েনি। সিনিয়ররা অনিয়মিত হয়ে পড়া বছরের শেষ সিরিজেও জোটে ধবলধোলাইয়ের লজ্জা। যে লজ্জা জুটেছিল বছরের প্রথম সিরিজেও, মার্চ-এপ্রিলে নিউজিল্যান্ড সফরে। এরপর টানা তিন সিরিজ জয়- জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২-১, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪-১ আর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-২ ব্যবধানে। কিন্তু বিশ্বকাপ ব্যর্থতায় ঢাকা পড়েছে ওই সাফল্যগাথা।
বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় ওয়ানডেতে অবশ্য এ বছর দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়েছে বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা আর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজ খেলে কেবল নিউজিল্যান্ডের কাছেই হেরেছে তারা। তামিম ইকবালের দল বিজয়কেতন উড়িয়েছে বাকি তিন সিরিজেই। ফেব্রুয়ারিতে ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের পর জুলাইয়ে জিম্বাবুয়েকে করেছে ধবলধোলাই। সবমিলে ১২ ম্যাচ খেলে জিতেছে আটটি, তাতে ৮০ পয়েন্ট নিয়ে ২০২৩ বিশ্বকাপ বাছাইয়ের নামে চলমান ওয়ানডে সুপার লিগ টেবিলে দুইয়ে রয়েছে টাইগাররা। র্যাঙ্কিংয়ে আছে সাত নম্বরে। ওয়ানডের মতো ব্যক্তিগত অর্জনেও উজ্জ্বল ছিলেন কেউ কেউ। দারুণ পারফরম্যান্সে আইসিসির মে মাসের সেরা হয়েছেন মুশফিকুর রহিম, পরে জুলাই মাসের সেরার খেতাব উঠেছে সাকিব আল হাসানের হাতে। এ বছরই টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে ষষ্ঠ অলরাউন্ডার হিসেবে ২০০ উইকেট আর ৪ হাজার রানের ডাবলস পূর্ণ করেছেন তিনি। এই সাকিবই আবার এ বছর একাধিক বিতর্কিত কাণ্ড ঘটিয়ে খবরের শিরোনাম হয়েছেন।
ওয়ানডেতে এ বছর সর্বোচ্চ উইকেট শিকারির তালিকায় সেরা পাঁচে জায়গা পেয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান (১৮ উইকেট নিয়ে চতুর্থ) আর সাকিব (১৭ উইকেট নিয়ে পঞ্চম)। ৬ টেস্টে ৩০ উইকেট নিয়ে এই সংস্করণে বছরের অষ্টম সফল বোলার তাইজুল ইসলাম। ২০ ম্যাচে ২৮ উইকেট নিয়ে টি-টোয়েন্টিতে পঞ্চম সেরা মোস্তাফিজ, ১৮ ম্যাচে ২৫ উইকেট নিয়ে সাকিব নবম। ওয়ানডেতে ব্যাটিংয়ে সেরা দশে আছেন তামিম ইকবাল (৪৬৪ রান নিয়ে তৃতীয়), মুশফিকুর রহিম (৪০৭ রান নিয়ে ষষ্ঠ) আর মাহমুদউল্লাহ (৩৯৯ রান নিয়ে অষ্টম)। ৫৭৫ রান নিয়ে টি-টোয়েন্টিতে নাইম শেখ আছেন ষষ্ঠ স্থানে। তিন সংস্করণ মিলে এ বছর ১ হাজার ৫৮ রান করে বাংলাদেশের সফল ব্যাটসম্যান লিটন দাস। মাহমুদউল্লাহ (১০৪৫) আর মুশফিকও (১০৩৩) খুব একটা পিছিয়ে ছিলেন না।