|
খাগড়াছড়ি আসনে জটিল সমীকরণ: মাঠে উত্তাল, বিএনপি নীরব আশাবাদী জামায়াত এনসিপি গণঅধিকার পরিষদ
মোঃ মোবারক হোসেন, খাগড়াছড়ি
|
![]() খাগড়াছড়ি আসনে জটিল সমীকরণ: মাঠে উত্তাল, বিএনপি নীরব আশাবাদী জামায়াত এনসিপি গণঅধিকার পরিষদ ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, বহুগোষ্ঠীর সহাবস্থান, এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব—সব মিলিয়ে এ আসনটি জাতীয় রাজনৈতিক মানচিত্রে সবসময়ই একটি বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। এবারের নির্বাচনে জাতীয় দলগুলোর তৎপরতা যেমন বেড়েছে, তেমনি আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর নীরবতা নতুন ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। ফলে জটিল একটি বহুমাত্রিক সমীকরণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে খাগড়াছড়ির নির্বাচনী এ আসনটি । খাগড়াছড়ি জেলার একমাত্র সংসদীয় আসনটি গঠিত—১১টি উপজেলায় বিস্তৃত পাহাড়ি উপত্যকা, দুর্গম গ্রাম, এবং বিচিত্র সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মানুষের সমন্বয়ে । পাহাড়ি ও বাঙালি মিলিয়ে ৫ লাখ ৪৫ হাজার ৭২৭ জন ভোটারের এ আসনে যে কোনো রাজনৈতিক দলকে ভোটযুদ্ধে সফল হতে হলে উভয় জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন অপরিহার্য। অন্যদিকে ইউপিডিএফ, জেএসএসসহ বিভক্ত আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মাঠ-নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবও এখানে নির্বাচনী সমীকরণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে । ফলে দলীয় পরিচিতির পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক পরিমণ্ডল, জনগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ প্রত্যাশা, এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকা নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে আসছে। জাতীয় দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সক্রিয়ভাবে মাঠে নামতে দেখা যাচ্ছে বিএনপিকে। দলটির জেলা সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া বর্তমানে নির্বাচনী প্রচারণায় সবচেয়ে এগিয়ে থাকা প্রার্থীদের মধ্যে একজন । দুইবারের এমপি ও সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে খাগড়াছড়ি ছাড়াও পার্বত্য জেলা গুলোতে তার পরিচিতি বেশ এগিয়ে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং দলের প্রতি আনুগত্য তাকে বিএনপির তৃণমূলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা এনে দিয়েছে আগে থেকেই । ওয়াদুদ ভূঁইয়া নির্বাচনী প্রস্তুতি প্রসঙ্গে বলেন—“দল আমাকে যে মূল্যায়ন করেছে, তা আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলারই প্রতিফলন। মাঠের রাজনীতিতে আমরা নিয়মিত সক্রিয়। প্রতিদিনই প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে যাচ্ছি, মানুষের সাথে কথা বলছি। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ধানের শীষ প্রতীক বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে ইনশাআল্লাহ্।" বিএনপির ভোটব্যাংকের বড় একটি অংশ পাহাড়ের বাঙালি অঞ্চল এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিরপেক্ষ জনগোষ্ঠী। তবে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী থাকায় এবার ওই ভোটের কিছু অংশ বিভাজিত হওয়ার সম্ভাবনা রাজনৈতিক মহলে আলোচনায় রয়েছে । এবার প্রথমবারের মতো খাগড়াছড়ি আসনে আনুষ্ঠানিক প্রার্থী ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। যদিও ভোটের মাঠে আঞ্চলিক সমিকরণে পিছিয়ে আছেন তারা। জামায়াতের প্রার্থী অ্যাডভোকেট এয়াকুব আলী চৌধুরী, এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মাওলানা কাওসার আজিজী—উভয়েই জেলার বিভিন্ন প্রান্তে গণসংযোগ, লিফলেট বিতরণ, এবং জনসংযোগ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এ দুই দলের রাজনৈতিক তৎপরতা বিএনপির স্থায়ী ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে প্রভাব কতটা হবে তা নির্ভর করবে নির্বাচনী পরিবেশ এবং আঞ্চলিক নিরব ভোটের আচরণের ওপর। গণঅধিকার পরিষদ ও এনসিপি: নতুন মুখে সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। গণঅধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে প্রার্থী ঘোষণা করেছেন গত বৃহস্পতিবার কেন্দ্র। জানা যায় খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলা মেরুং ইউনিয়নের কৃতি সন্তান সাকিব হোসাইন। বর্তমানে তিনি সদস্য, উচ্চতর পরিষদ ও সমন্বয়ক, রাজনৈতিক লিয়াজো বিষয়ক উপকমিটি গণ অধিকার পরিষদের পদে আছেন। সাকিব হোসাইন আাগামী ৩ তারিখে ঢাকা থেকে খাগড়াছড়িতে প্রবেশ করবে বলে জানা গেছে। এনসিপির (মূখ্য সংগঠক দক্ষিণাঞ্চল) মনজিলা সুলতানা ঝুমা ইতোমধ্যেই মাঠে সক্রিয়তা দেখাচ্ছেন। দল এখনও প্রার্থী চূড়ান্ত করেনি। তবে মনোনয়ন পেলেই বৃহৎ পরিসরে মাঠে নামবার কথা বলছেন। তবে এই দুই দলের উপস্থিতি তরুণ ভোটারদের একটি অংশকে আকৃষ্ট করতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ । খাগড়াছড়ির রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি আঞ্চলিক সংগঠন -ইউপিডিএফ ও জেএসএস(সংস্কার ও মূলধারা)— এখনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ বা সমর্থন বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি। তাদের অবস্থান এখনো অস্পষ্ট হওয়ায় খাগড়াছড়ির ভোটের চিত্রও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। ইউপিডিএফ মুখপাত্র অংগ্য মারমা জানিয়েছেন— “সুষ্ঠু পরিবেশ থাকা সাপেক্ষে আমরা নির্বাচনে অংশ নেব। অন্যথায় বর্জনের সিদ্ধান্তও আসতে পারে।”দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রসিত বিকাশ খীসা সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন। জেএসএস (সংস্কার) প্রচার বিভাগের প্রতিনিধি জুপিটার চাকমা জানিয়েছেন—“দলগতভাবে অথবা স্বতন্ত্র সমর্থনে নির্বাচনে অংশগ্রহণের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে প্রার্থী এখনো চূড়ান্ত নয়।” সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দলের সভাপতি বিমল কান্তি চাকমা-এর নাম ঘুরছে। উপজাতীয় রাজনীতিতে এই সংগঠনগুলোর প্রভাব এতটাই ব্যাপক যে তাদের অবস্থান নির্বাচনী ফলাফলে সরাসরি ভূমিকা রাখবে নিঃসন্দেহে। ভোটের মাঠে জনমতের ভাষ্য অনুযায়ী, বিগত দিন জনগণের সুখে-দুঃখে যাদের পাশে পেয়েছেন এবং পাহাড়ের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে পারবে, তাকেই ভোট দিবেন। খাগড়াছড়ি আসনের ভোটারদের প্রায় অর্ধেক পাহাড়ি জনগোষ্ঠী। এ কারণে এই আসনে— পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় জনগোষ্ঠীর কাছে প্রার্থী কতটা গ্রহণযোগ্য, আঞ্চলিক সংগঠনগুলো কোন দিকে নীরব সমর্থন দেবে, এবং নির্বাচনী পরিবেশ কতটা স্থিতিশীল থাকবে— এই কয়েকটি বিষয় চূড়ান্তভাবে ফল নির্ধারণ করবে । রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, “জাতীয় দলের চেয়ে আঞ্চলিক সমীকরণই এখানে বেশি প্রভাব ফেলে। স্থানীয় ইস্যুর গুরুত্ব এবং এলাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি শেষ মুহূর্তে ভোটের আচরণ পাল্টে দিতে পারে।” অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনার মিশ্রণে নির্বাচনী মাঠ । সব মিলিয়ে আগামী সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে খাগড়াছড়ি আসনটি আবারও কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও জটিলতার আসনে পরিণত হয়েছে। জাতীয় দলগুলোর তৎপরতা, ইসলামিক রাজনৈতিক শক্তির উপস্থিতি, এবং আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর নীরব কিন্তু প্রভাবশালী অবস্থান— তিন দিকের এই ত্রিমুখী সমীকরণ নির্বাচনী মাঠকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। কাকে চায় পাহাড়? কোন সমীকরণে বদলে যাবে ভোটের চিত্র? এবং কোন দিকে ঝুঁকবে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নীরব সমর্থন? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে ফেব্রুয়ারির ভোটে। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়—এই আসনের ফলাফল আবারও জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে । |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
