ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
শনিবার ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪৩২
সবাই সব জেনে ও বুঝে না-জানার ‘ভান’ করে যাচ্ছেন
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Tuesday, 25 November, 2025, 1:27 PM

সবাই সব জেনে ও বুঝে না-জানার ‘ভান’ করে যাচ্ছেন

সবাই সব জেনে ও বুঝে না-জানার ‘ভান’ করে যাচ্ছেন

আশির দশকে মিরপুর এলাকায় জমি কিনে বাড়ি বানানো একজন সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হচ্ছিল সেই এলাকার ৩০ বছরের চেহারা নিয়ে। তিনি এলাকা ঘুরে ঘুরে জানান, তার বাড়ির আশপাশের পুরো এলাকা তখন ছিল জলাভূমি। ২০০৮ সালেও ওই এলাকার রাস্তাটা তার বাড়িতে এসে শেষ হতো। এরপর থেকে শুরু হতো ছোট খাল—যা তখন নালা আকার ধারণ করেছে। অথচ এখন সেখানে আর কোনও নালা বা খাল দূরে থাক, পানির অস্তিত্ব নেই। ইটের পর ইট গেঁথে ১০ তলা পর্যন্ত উঠে গেছে। গায়ে গায়ে লাগানো। এসব বাড়ি বানানোর সময় জলাভূমিতে বাড়ি তুলতে যা যা করণীয়, তার সব কি করা হয়েছিল? জলাভূমির ওপর বাড়ি তুলেছেন যারা, তাদের এই ভবনগুলো সুরক্ষিত তো?

রাজধানীতে বাড়ি বানাতে রাজউক থেকে কী কী অনুমোদন লাগে—প্রশ্নের জবাবে সদ্য নিজ উদ্যোগে বাড়ি বানিয়েছেন এমন একজন বলেন, ‘দুই ধরনের অনুমোদন লাগে। একটা হলো ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র, আর আরেকটা হলো নকশা অনুমোদন। ভূমিটা খাস, সরকারি, জলাভূমি, পুকুর কিনা—এসব ম্যাপে দেখে অনুমোদন দেওয়া হয়, সেটা সশরীরে পরিদর্শন করে না। নকশা অনুমোদনের আগে একবার পরিদর্শনে আসে। তবে ‘সিস্টেমে’ কাজ হয়।’

সিস্টেমটা কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই সব জানি, ঠিকভাবে নিয়ম না মেনে বাড়ি বানালে কী ক্ষতি এবং নিজের ঝুঁকি সেটাও জানি, কিন্তু না জানার ভান করি।’

শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার কম্পনে সরকারি তথ্য অনুযায়ী ঢাকাসহ নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে অন্তত ১০ জন মারা গেছেন, আহত হয়েছেন সাড়ে ৩০০ মানুষ। ফাটল দেখা দিয়েছে বহু ভবনে। কয়েকটি হেলেও পড়েছে। এরপর আবারও নড়েচড়ে বসেছেন সবাই। ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা শহর ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে আছে। আর নগর পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, আমাদের এই শহর আদৌ বড় ধরনের ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রস্তুত না। তার কারণ এর অপরিকল্পিত নগরায়ণ। তারা বলছেন, ঢাকায় বিনা বাধায় শুধু জমি বিক্রি ও ‘উন্নয়ন’ চলছে। কিন্তু মানুষের বাসযোগ্যতা কম গুরুত্ব পাচ্ছে। তারা দ্রুত শহরের বিকেন্দ্রীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দাবি তুলে বলছেন ঢাকায় অতিরিক্ত চাপ কমাতে হবে।

জলাধার ভরাট করে বাড়ি

ডেসকোর রিপোর্ট বলছে, ১৯৮৮ সালে প্রায় ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ এলাকা ছিল জলাভূমি। কিন্তু ২০১৬ পর্যন্ত সেই পরিমাণ কমে ১২ দশমিক ১৩ শতাংশে নেমে এসেছে। জীববিজ্ঞান জার্নাল তাদের এক গবেষণায় দেখায়, ১৯৬০ সালে ঢাকার “নিচু ও জলাভূমি” ভূমি ছিল প্রায় ১৩,৫২৭.৫৮ হেক্টর। ২০০৮ সালে সেই এলাকা কমে ৬,৪১৪.৫৭ হেক্টর হয়ে যায়। এর মানে প্রায় ৫৩ শতাংশ জলাভূমি হারিয়েছে সেই সময় পর্যন্ত। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) ২০২০ সালের রিপোর্টে দাবি করছো হয়েছে—১৯৯৯ থেকে দুই দশকে প্রায় ৩/৪ অংশ জলাধার হারিয়েছে ঢাকা।
সবাই সব জেনে ও বুঝে না-জানার ‘ভান’ করে যাচ্ছেন

সবাই সব জেনে ও বুঝে না-জানার ‘ভান’ করে যাচ্ছেন

নগর পরিকল্পনার কাজ করেন যারা, তারা শঙ্কা জানিয়ে বলছেন, ঢাকার অনেক ভবন ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। অথচ রাজউক এসব কাঠামো নিয়মিত পরীক্ষা করে দেখছে না যে, তা ভূমিকম্প‑সহনশীলভাবে ডিজাইন করা হয়েছে কিনা। বিশেষ করে যারা ভরাট জমিতে ভবন তৈরি করছেন, তাদের জন্য সমস্যা বেশি। কারণ বদল হওয়া নরম মাটি ভূমিকম্পের শক্তি বাড়াতে পারে। রাজউকের আরবান রেজিলেন্স প্রজেক্টের আওতায় ২০২৩ সালে ১,৮২৫টি স্থানে মাটির পরীক্ষা করা হয়েছিল। কিন্তু তার পরের উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান প্রকৌশলী (বাস্তবায়ন) মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘‘ভবন ভূমিকম্প‑সহনশীল কিনা, তার কোনও ডিজাইন তো আমরা করি না। এটা সাধারণ যারা ডিজাইনার আছেন, বাড়ি নির্মাণের সময় সেটা তারা করে থাকেন। ২০২৩ সালে থার্ড পার্টি দিয়ে রাজধানীর ভবনগুলো ভূমিকম্প সহনশীল কিনা, সেটা আমাদের যাচাই করার কথা ছিল। কিন্তু নানান কারণে সেটা করা হয়নি। তবে এখন সেটা বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। আজকের (সোমবার, ২৪ নভেম্বর) বৈঠকেও সেই বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।’’

তিন পক্ষের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই

বাড়িওয়ালারা ইঞ্জিনিয়ার বা আর্কিটেক্ট দিয়ে বাড়ির প্ল্যান করে রাজউকে জমা দেয় এই শর্তে যে রাজউকের নিয়ম মোতাবেক কাজটি করবেন। পরে তারা সেটা না মানলে জরিমানা, কিংবা শাস্তি দিতে হলে সেই বাড়িওয়ালাদেরই দেওয়া উচিত। এর দায়ভার রাজউকের না বলে রাজউক চেয়ারম্যানের দেওয়া বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আখতার মাহমুদ বলেন, ‘‘এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য বক্তব্য। তাদের ইমারত পরিদর্শক আছেন, সরকার তাদের বেতন দেয়। ভবন যথাযথ নিয়ম মেনে হচ্ছে কিনা, তাদের কাজ সেটা দেখা। সেই কাজে কোনও ব্যত্যয় ঘটলে অবশ্যই তাকে দায় নিতে হবে।’’

এক্ষেত্রে আখতার মাহমুদ তিন পক্ষের দায় চিহ্নিত করে বলেন, ‘‘বাড়ির মালিক যদি স্বল্প মেয়াদি লাভের উদ্দেশ্যে কোনও ব্যত্যয় ঘটান, তবে তার শাস্তি হতে হবে। একটা বাড়ির কারিগরি দায়িত্বে যে স্থপতি, সাইট প্রকৌশলী থাকেন—কাজটা ঠিকমতো না হলে সেই দায়িত্ব তাদের। রাজউকের শর্ত মানলো কিনা সেটা পরিদর্শন করে সঠিক রিপোর্ট না দিলে, সেই দায় রাজউককে নিতে হবে। আমরা সবাই যার যার কাজটা জানি— কীভাবে কাজটা ‘অনিয়মের’ মধ্য দিয়ে বের করা হয়, সেটাও জানি কিন্তু দায় নিতে চাই না। কী হচ্ছে আমি জানি না, বা না জানার ভান করলে কী ঝুঁকি এড়ানো যাবে?’’

আইওয়াশ না করে দায়িত্বশীল হন

কয়েক দফায় ভূমিকম্প হওয়ার পর রাজধানীতে ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ৩০০টি ছোট-বড় ভবন চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজউক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম। ২৪ নভেম্বর রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে এ কথা জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘‘সমন্বিতভাবে কাজ না করা গেলে ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি সামলানো সম্ভব না।’’ সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘‘যথাযথ নিয়ম মেনেই ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়। রাজউকে অর্থের বিনিময়ে কোনও কাজ হয় না।’’

নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনাবিদ ড. আখতার মাহমুদ সঠিক জরিপের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘‘যে ৩০০ ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা হয়েছে দাবি করা হচ্ছে, সেটা ‘আইওয়াশ’ ছাড়া কিছু না। কোনও একটা ঘটনা ঘটলেই এক ধরনের সার্ভের কথা বলা হয়। কিন্তু তার ভিত্তিতে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। ‘আইওয়াশ’ না করে দায়িত্বশীল আচরণ করার সময় হয়েছে। প্রত্যেক ভবন অ্যাসেসমেন্ট করতে হবে। দরকার হলে থার্ড পার্টিকে দায়িত্ব দিন। দেশের প্রকৌশলীদের ডেকে একটা প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে কাজটি করতে হবে এবং শুরু করতে হবে পাবলিক ভবনগুলো দিয়ে—শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শপিং মল। সিটি করপোরেশনকে দায়িত্ব নিতে হবে। এরপর প্রাইভেট ভবনের ক্ষেত্রেও সেটা করতে হবে। তাদের ভয় না দেখিয়ে প্রয়োজনীয়তাটা বুঝাতে হবে এবং অ্যাসেসমেন্টের সহজ পদ্ধতি বের করতে হবে।

এই তিনশত চিহ্নিত ভবন নিয়ে পরবর্তী পরিকল্পনার বিষয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান প্রকৌশলী (বাস্তবায়ন) মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘‘এগুলোকে প্রিলিমিনারি স্টেজের ঝুঁকি চিহ্নিত করে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে রাজউক চেয়ারম্যানের সঙ্গে আমিসহ আমাদের একটা টিম সরেজমিন কাজ করেছি। এই ভবনগুলো একেবারে ভাঙা হবে, নাকি রিপেয়ার করলে ঠিক হয়ে যাবে, সে বিষয়ে আমাদের টিম ডিটেইলস তথ্য দিলে বিস্তারিত বলা যাবে। এখন প্রাথমিকভাবে ওই ভবনগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।’’

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status