শুক্রবার, ২২ অক্টোবর, 2০২1
নতুন সময় ডেস্ক
Published : Thursday, 14 October, 2021 at 6:41 AM
মহাজনদের হয়ে কিডনি ব্যবসার শক্ত নেটওয়ার্ক

মহাজনদের হয়ে কিডনি ব্যবসার শক্ত নেটওয়ার্ক

নাম মোশারফ হোসেন। জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার বহুতি গ্রামের বাসিন্দা। ২০১১ সালের শুরুতে তিনি অন্য দালালদের সঙ্গে চার লাখ টাকা চুক্তিতে নিজের কিডনি বিক্রি করেছিলেন। এর মধ্যে দুই লাখ টাকা নিয়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে গিয়ে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কিডনি দেন। পরে বাকি দুই লাখ টাকা আর পাননি। সেই তিনিই পরে যুক্ত হন কিডনি বিক্রির চক্রে। ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি কিডনি বেচাকেনায় দালাল হিসেবে কাজ করতেন। এর পর বয়সের কারণে তিনি 'অবসর' নেন। তার পরিবর্তে ওই স্থানে যুক্ত করেন তার ছেলে জহুরুল ইসলামকে।

জহুরুল ইসলাম বলেন, গরিব মানুষকে সহযোগিতা করলে যদি দালাল হতে হয়, তাহলে আর বলার কী আছে!
মোশারফ যে সময় দালালির ব্যবসা করতেন, তখন তার মহাজন ছিলেন তারেক আযম ওরফে বাবুল চৌধুরী ও সাইফুল ইসলাম। তবে তার ছেলে জহুরুল তাদের হয়ে কাজ করেন না। ঢাকায় তার মহাজনের নাম রাইহান হোসেন বলে কথা প্রসঙ্গে জানা গেল।

জহুরুল জানান, বর্তমানে ঢাকায় বসে বেশ কয়েকজন ব্যক্তি কিডনি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। শুধু তারেক আযম, সাইফুল ইসলাম, শাহরিয়ার ইমরান ও রাইহান হোসেনের মতো মহাজনরাই নন; আরও অনেকেই আছেন। ওই মহাজনদের হয়ে এলাকার অনেক পুরাতন ও নতুন দালাল কাজ করছেন।

জহুরুলের পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ব্যবসার পরিচিতি আছে এলাকায়। তার মতো আরও অনেকে হাল ধরেছেন পৈতৃক কিডনি ব্যবসার। গত কয়েক দিন কিডনি ক্রেতার বেশে কালাই উপজেলার অনেক গ্রাম ঘুরে দেখা হয়। এতে দেখা যায়, ২০১৫ সাল পর্যন্ত উপজেলার ২৩টি গ্রামে কিডনি বেচাকেনার তৎপরতা ছিল। কিন্তু গত ছয় বছরে নতুন করে আরও অন্তত আটটি গ্রাম যুক্ত হয়েছে। এখন অন্তত ৩১টি গ্রামে ঢাকার মহাজনদের হয়ে কিডনি ব্যবসার শক্ত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন স্থানীয় দালালরা।

গ্রামগুলো হলো- মাত্রাই ইউনিয়নের ভেরেন্ডি, উলিপুর, সাঁতার, কুসুমসাড়া, অনিহার, ভাউজাপাতার, শিবসমুদ্র, পাইকশ্বর, ইন্দাহার, ছত্রগ্রাম, উদয়পুর ইউনিয়নের বহুতি, মোহাইল, থল, বাগইল, মাস্তর, জয়পুর বহুতি, বহুতি, নওয়ানা, দুর্গাপুর, উত্তর তেলিহার, ভুষা, কাশিপুর, বিনইল ও পূর্বকৃষ্ণপুর এবং পুনট ইউনিয়নের এলতা, আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নের রাঘবপুর, বোড়াই, নওপাড়া, বালাইট এবং পৌর এলাকার থুপসাড়া ও কাতাইল। ২০১১ সালে যখন কিডনি

বিক্রি নিয়ে সারাদেশে হৈচৈ পড়ে, তখন স্থানীয় প্রশাসন এমন তৎপরতা বন্ধে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিল। পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও কাজ করে। তবে ভয়াবহ এ ব্যবসা থামেনি।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১১ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ৩১ গ্রামের তিন শতাধিক অভাবী মানুষ তাদের একটি করে কিডনি বিক্রি করে দিয়েছেন। ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত আরও অর্ধশতাধিক মানুষ কিডনি বিক্রি করেছেন। গত ১০ মাসে শুধু বহুতি গ্রামেরই ৯ জন তাদের কিডনি বিক্রি করেছেন। পার্শ্ববর্তী জয়পুর বহুতি গ্রামে এ সংখ্যা চার।

৩১টি গ্রামে বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অন্তত ২২ জন এখন কিডনি দিতে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে অবস্থান করছেন। এর মধ্যে রয়েছেন- বিনইল গ্রামের ভুট্টো মিয়া, শাহাদুল ইসলাম ও এলতা গ্রামের শামিম হোসেন।

বোড়াই গ্রামের স্কুলশিক্ষক আব্দুল আজিজ বলেন, কিডনি হারানো লোকের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দালালদের মাধ্যমে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে কিডনি বিক্রির ভয়ংকর তৎপরতা। তবে যে পরিমাণ কিডনি বিক্রি হয়েছে, তার প্রায় অর্ধেকই বহুতি, জয়পুর বহুতি, দুর্গাপুর আর বোড়াই গ্রামের লোকেরা বিক্রি করেছেন।

ভেরেন্ডি গ্রামের বাসিন্দা ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জিয়াউর রহমান বাদশা বলেন, এলাকায় এখন প্রকাশ্যেই চলছে কিডনির ব্যবসা। আশপাশের ৩১ গ্রামের প্রত্যেকের শরীর পরীক্ষা করলে অর্ধেক মানুষেরই একটি করে কিডনি খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রতিদিন দলে দলে মানুষ কিডনি বিক্রির জন্য ঢাকায় ছুটছেন। কিডনি বিক্রি করে ফেরার পর তারাই আবার দালাল বনে যাচ্ছেন।

স্থানীয় চৌমুহনী বাজারের পল্লি চিকিৎসক আমিনুল ইসলাম বলেন, ২০১৬ সালের শুরু থেকে ২০১৯ সালের শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের নজরদারিতে কিডনি বেচাকেনা মোটামুটি বন্ধ ছিল। কেন যেন নতুন করে আবার অনেক অভাবী নারী-পুরুষ কিডনি বিক্রি করছেন।

৩১টি গ্রাম ঘুরে প্রায় ১০০ দালালের খোঁজ পাওয়া গেছে। নামধামও জানা গেছে অনেকের। তাদের অধিকাংশই ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট শহরে রিকশাচালকের কাজ করেন। তারাই এলাকার মানুষকে মহাজনের কাছে নিয়ে যান।

সম্প্রতি কিডনি বিক্রি করেছেন বহুতি গ্রামের সাজেদা বেগম। গতকাল বুধবার তিনি বলেন, সংসারে অভাব। কী করব? তাই কিডনি বিক্রি করেছি। তিনি বলেন, 'গত জুলাই মাসে নিজ গ্রামের পুরোনো দালাল মোস্তফার সঙ্গে ঢাকায় যাই। পরে সাড়ে তিন লাখ টাকায় কিডনি দিতে রাজি হই। ভারতে গিয়ে ঢাকার এক মানুষের বোনকে কিডনি দিই। সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে বাড়িতে এসেছি। এখন কোনো কাজকর্মই করতে পারছি না। ভয়ে ডাক্টারের কাছেও যেতে পারছি না।'

২০২০ সালের প্রথম থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত যারা কিডনি বিক্রি করেছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন বিনইল গ্রামের হান্নান। কিডনি বিক্রির পর তিনি এখন দালাল হয়েছেন বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। কিডনি বিক্রি করেছেন এলতা গ্রামের হবিবর রহমান। তিনিও বর্তমানে দালাল। এ ছাড়া কিডনি বিক্রি করেছেন থল গ্রামের সায়েম হোসেন, হাটপুকুর গ্রামের জাহিদুল ইসলাম, বহুতি গ্রামের সাজেদা বেগম, রুবেল হোসেন, জয়পুর বহুতি গ্রামের মিলন রহমান। একই গ্রামের মামুনুর রশিদ দু'দিন আগে র‌্যাবের হাতে আটক দুধাইল গ্রামের তাজুল ইসলাম ওরফে তাজু মারফত তার কিডনি বিক্রি করেছেন। এ ছাড়া দুর্গাপুর গ্রামের গাজী মিয়া ও শাজাহান আলী দালাল জহুরুলের মারফত কিডনি বিক্রি করেছেন। এ রকম অর্ধশতাধিক মানুষ তাদের কিডনি বিক্রি করেছেন।

জানা যায়, ২০১৬ সালের ১ অক্টোবর কালাই উপজেলার দুধাইল গ্রামের সুজাউল মণ্ডল নামের এক ব্যক্তি দালালের মাধ্যমে ভারতে গিয়ে তার কিডনি বিক্রি করেন। যাওয়ার আগে তিনি চার লাখ টাকা চুক্তির মধ্যে দুই লাখ টাকা পান। দেশে ফিরে আর বাকি টাকা পাননি। ভয়ে তিনি কাউকে কিডনি বিক্রির কথা বলেননি। টাকা চাইতে গেলে দালালরা তাকে ভয়ভীতি, প্রাণনাশ ও গুম করার হুমকি দেন। একপর্যায়ে গত ১১ অক্টোবর রাতে তিনি কালাই থানায় উপস্থিত হয়ে স্থানীয় ও ঢাকায় বসবাসরত কয়েকজন দালালের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। মামলায় যেসব দালালের নাম আছে তারা হলেন জয়পুর বহুতি গ্রামের মান্নান, দুধাইল গ্রামের তাজুল ইসলাম ওরফে তাজু, হবিগঞ্জের শাহরিয়ার ইমরান, কুমিল্লার মেহেদি হাসান এবং চাঁদপুরের সাইফুল ইসলাম। কালাই থানায় মামলার পর গত মঙ্গলবার জয়পুরহাট ও ঢাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। বুধবার সকালে তাদের কালাই থানায় সোপর্দ করা হয়। আদালতের মাধ্যমে এখন তারা জেলহাজতে রয়েছেন।

বেশ কয়েকজন দালালের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখন মূলত দু'জন মহাজন বেশি সক্রিয়। এর একজনের নাম তারেক আযম ওরফে বাবুল চৌধুরী। তার সহযোগী হিসেবে রয়েছেন সাইফুল ইসলাম। আরেক মহাজন হলেন রাইহান হোসেন।

কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সেলিম মালিক জানান, ২০১৫ সালের শেষ দিকে বাবুল, সাইফুল এবং দালাল আব্দুস সাত্তার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পরের বছর মার্চের দিকে তারা জামিনে ছাড়া পান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন দালাল জানান, এই তিনজন এখনও সক্রিয় রয়েছেন। ১২ অক্টোবর যে পাঁচজনকে র‌্যাব গ্রেপ্তার করেছে, তারা বাবুল চৌধুরীরই লোক। তিনিই চক্রটির মূল হোতা। বাবুল ঢাকার রায়েরবাগ এলাকায় থাকেন। সাইফুল ইসলামও ঢাকায় থাকেন। তবে আব্দুস সাত্তার কালাইয়ে থাকেন।

ফোনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। বাবুল ও সাইফুলের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম পাওয়া সম্ভব হয়নি।
মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন-১৯৯৯-এর ৯ ধারায় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ আইন অনুযায়ী, কেউ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিক্রি বা ক্রয় কিংবা সহায়তা করলে সর্বনিম্ন তিন থেকে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। শাস্তির বিধান অক্ষুণ্ণ রেখে ২০০৯ সালে ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনেও এটি সংযোজন করা হয়।

কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সেলিম মালিক বলেন, প্রচলিত ফৌজদারি আইনে মানব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেনাবেচা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিডনি বিক্রি বন্ধে যা যা করা দরকার, সবই করা হচ্ছে। দালাল ও বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার অব্যাহত রাখা হয়েছে।

ওসি বলেন, গত সোমবার দুধাইল গ্রামের কিডনি বিক্রেতা সুজাউল মণ্ডল বাদী হয়ে বেশ কয়েকজন দালালকে আসামি করে মামলা করেছেন। পরে র‌্যাব সদস্যরা কিডনি বেচাকেনার সঙ্গে জড়িত পাঁচ দালালকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে কালাই থানায় সোপর্দ করেছেন। বুধবার দুপুরে তাদের জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।

কালাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মিনফুজুর রহমান মিলন বলেন, অভাবি মানুষ কিডনি বিক্রির ভয়ংকর কাজের দিকে ঝুঁকছেন। দালালদের খপ্পরে পড়ে স্বেচ্ছায় অঙ্গহানি ঘটিয়ে তারা বাড়ি ফিরছেন। অভাব তাড়াতে আত্মঘাতী পথ বেছে নিলেও মুক্তি মিলছে না তাদের। উল্টো অল্প বয়সে অসুস্থ আর কর্মহীন হয়ে পড়ছেন এসব মানুষ। প্রশাসনের সঙ্গে আলাপ করে তাদের বিরদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জয়পুরহাট জেলা প্রশাসক শরিফুল ইসলাম বলেন, কিডনি বিক্রির সঙ্গে যারা জড়িত, সেসব দালালসহ মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করে অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে। সবাই সহযোগিতা করলে এটা নির্মূল করা সহজ হবে।



পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত


DMCA.com Protection Status
সম্পাদক ও প্রকাশক: নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, ২৫/১ পল্লবী, মিরপুর ১২, ঢাকা- ১২১৬
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
Developed & Maintainance by i2soft