শুক্রবার, ২২ অক্টোবর, 2০২1
নতুন সময় প্রতিবেদক
Published : Wednesday, 22 September, 2021 at 10:23 AM, Update: 23.09.2021 10:29:41 AM
পারিবারতন্ত্রের দিন শেষ আ.লীগে

পারিবারতন্ত্রের দিন শেষ আ.লীগে

উত্তরাধিকার সূত্রে সংসদ সদস্য (এমপি) পদে মনোনয়ন পাওয়া কিংবা পদপদবি জুটিয়ে নেওয়ার দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে আওয়ামী লীগে। পারিবারিক রাজনীতির বলয় থেকে বেরিয়ে এসে নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে ত্যাগী ও যোগ্য নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের দিকে ঝুঁকছে মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দলটি। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন ইতোমধ্যে।

১১ সেপ্টেম্বর দলের মনোনয়ন বোর্ডের যৌথ সভায় তিনি বলেছেন, নেতা-মন্ত্রী কিংবা সংসদ সদস্যদের সন্তানরা রাজনীতিতে আসতে চাইলে তারা পরিশ্রম করে আসুক। রাজনীতির মাঠে সময় দিক। তাদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা কতটুকু, তা দেখে মনোনয়নের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হবে।

শেখ হাসিনার এই নির্দেশনার বাস্তব প্রতিফলন দেখা গেছে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রেও। ক্ষমতার টানা তৃতীয় মেয়াদের পৌনে তিন বছরে ১৭ জন সংসদ সদস্য হারিয়েছে আওয়ামী লীগ। এর মধ্যে শুধু কিশোরগঞ্জ-১, সিরাজগঞ্জ-১ এবং বগুড়া-১-এই তিনটি আসন ছাড়া বাকি সবকটি উপনির্বাচনে নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবার নয়, দলের ত্যাগী নেতাদেরই বেছে নেওয়া হয়েছে।

সর্বশেষ কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসনের উপনির্বাচনে দলের প্রয়াত সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের সাবেক ডেপুটি স্পিকার অধ্যাপক আলী আশরাফের আসনে তার ছেলে মুনতাকিম আশরাফ প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু ওই আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয় বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. প্রাণ গোপাল দত্তকে। তাকে মনোনয়ন দেওয়ার দিনই শেখ হাসিনা এ বার্তা পৌঁছে দেন দলের শীর্ষ নেতাদের।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, যুগের পর যুগ এই উপমহাদেশে একটি রেওয়াজ চালু আছে যে, পিরের ছেলে পির হয়, নেতার ছেলে নেতা হয়। আওয়ামী লীগ এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। আওয়ামী লীগের মূল শক্তি তৃণমূলের নেতাকর্মী ও জনগণ। মন্ত্রী বা নেতার ছেলে মন্ত্রী কিংবা নেতা হবে, এমপির ছেলে এমপি হবে-এই রেওয়াজে আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে না। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রার্থীর দলের প্রতি, জনগণের প্রতি কমিটমেন্ট, রাজনীতিতে তার অবদান ও গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় নেয় সবার আগে।

মাহবুবউল আলম হানিফ আরও বলেন, চলতি সংসদে আমরা ১৭ জন সদস্যকে হারিয়েছি। এর মধ্যে তিনজনকে পরিবারের মধ্য থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই তিনজনেরও বর্ণাঢ্য অতীত রাজনৈতিক ইতিহাস আছে। সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের ছোট বোন ডা. সৈয়দা জাকিয়া নূর লিপি মেডিকেলে পড়ার সময় ছাত্রলীগ করতেন। ছাত্ররাজনীতি করতেন। মোহাম্মদ নাসিমের ছেলে তানভির সাকিল জয়ও ছাত্ররাজনীতি করতেন। ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে এমপিও হয়েছেন। একইভাবে আবদুল মান্নানের স্ত্রী সাহাদার মান্নান থানা আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিন সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এই তিনজনের কেউই উড়ে এসে এমপি হননি। আর বাকি আসনগুলোর উপনির্বাচনে তৃণমূল থেকে উঠে আসা নেতাদের মধ্য থেকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, মন্ত্রীর ছেলে মন্ত্রী হবে, এমপির ছেলে এমপি হবে, নেতার ছেলে নেতা হবে-এটাই আমাদের সমাজে প্রচলিত ধারণা ও বিশ্বাস। মানুষের এই ধারণা ও বিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত হবে পরিবারের বাইরে থাকা দক্ষ, যোগ্য, শিক্ষিত ও গ্রহণযোগ্য নেতাদের এগিয়ে আসার সুযোগ দেওয়া।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমান একাদশ জাতীয় সংসদের ১৯ জন সদস্য গত পৌনে তিন বছরে মারা যান। যাদের ১৭ জন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের, অন্য দুজন প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির। দেশের সংসদের ইতিহাসে এত স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এতসংখ্যক সংসদ সদস্যের মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেনি অতীতে। প্রয়াত সংসদ সদস্যদের ছেলে, মেয়ে, স্ত্রী এমনকি ভাই-বোনদেরও দেখা গেছে শূন্য আসনে দলীয় মনোনয়ন পেতে আগ্রহ প্রকাশ করতে। কিন্তু দিনশেষে নৌকার মনোনয়ন পেয়েছেন ত্যাগী নেতারাই।

চলতি সংসদের যাত্রাই শুরু হয় সংসদ সদস্যের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিনদিন পরই ২০১৯ সালের ৩ জানুয়ারি ব্যাংককে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।

অবশ্য সৈয়দ আশরাফ নির্বাচিত হওয়ার পর গেজেট প্রকাশ হলেও দেশের বাইরে চিকিৎসাধীন থাকায় তিনি শপথ নিতে পারেননি। সেই হিসাবে তিনি একাদশ সংসদের সদস্য হিসাবে গণ্য হননি। একাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার আগেই তিনি মারা যান। পরে এই আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দেয় সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের ছোট বোন ডা. সৈয়দা জাকিয়া নূর লিপিকে।

একাদশ জাতীয় সংসদের সদস্যদের মধ্যে আওয়ামী লীগের চারজন মহামারি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারান। সর্বপ্রথম করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে মারা যান সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাসিম। তিনি গত বছর ১৩ জুন রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা জান। ওই বছরই ২৭ জুলাই করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান নওগাঁ-৬ আসনের সদস্য ইসরাফিল আলম। ১১ মার্চ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান সিলেট-৩ আসনের সদস্য মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী। গত ১৪ এপ্রিল মারা যান সাবেক আইনমন্ত্রী ও কুমিল্লা-৫ আসনের সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু।

সরকারদলীয় এই চারজন সদস্যের শূণ্য আসনের উপনির্বাচনে পরিবারের ভেতর থেকে দলীয় মনোনয়ন পান শুধু একজন। মোহাম্মদ নাসিমের ছেলে তানভির সাকিল জয়কে বাবার আসনে মনোনয়ন দেয় আওয়ামী লীগ। যদিও তানভির শাকিল জয় তার বাবার আসন থেকে এর আগেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। বাকি তিনটি আসনেই নতুন মুখকে নৌকার দায়িত্ব দেন ক্ষমতাসীনরা।

সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১০ জানুয়ারি বাগেরহাট-৪ আসন থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের মোজাম্মেল হোসেন, ১৮ জানুয়ারি বগুড়া-১ আসনের আবদুল মান্নান, ২১ জানুয়ারি সাবেক জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী যশোর-৬ আসনের ইসমাত আরা সাদেক, ২ এপ্রিল সাবেক ভূমিমন্ত্রী পাবনা-৪ আসনের শামসুর রহমান শরীফ, ৬ মে ঢাকা-৫ আসনের হাবিবুর রহমান মোল্লা এবং ১০ জুলাই সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ঢাকা-১৮ আসনের অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন মারা যান।

একাদশ সংসদের প্রথম বছরে ২০১৯ সালের ৯ জুলাই মারা যান সংরক্ষিত আসনের সদস্য রুশেমা বেগম, একই বছরের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশ জাসদের কার্যকরী সভাপতি চট্টগ্রাম-৮ আসনের মঈন উদ্দীন খান বাদল ও ২৭ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের গাইবান্ধা-৩ আসনের মো. ইউনুস আলী সরকার মারা যান। মঈন উদ্দীন খান বাদল বাংলাদেশ জাসদের নেতা হলেও তার দল নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত না হওয়ায় তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নৌক প্রতীকে নির্বাচন করেন। সেই হিসাবে তিনি সংসদে আওয়ামী লীগেরই সংসদ সদস্য ছিলেন।

এ বছর ২ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জ-৬ আসনের হাসিবুর রহমান স্বপন, ৪ এপ্রিল ঢাকা-১৪ আসনের সদস্য আসলামুল হক মারা যান। বগুড়া-১ আসনের সদস্য আবদুল মান্নানের শূন্য আসনে স্ত্রী সাহাদারা মান্নানকে মনোনয়ন দেয় আওয়ামী লীগ।


পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত


DMCA.com Protection Status
সম্পাদক ও প্রকাশক: নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, ২৫/১ পল্লবী, মিরপুর ১২, ঢাকা- ১২১৬
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
Developed & Maintainance by i2soft