শুক্রবার, ২২ অক্টোবর, 2০২1
আঁচল ভোহরা
Published : Wednesday, 22 September, 2021 at 10:07 AM, Update: 22.09.2021 10:33:32 AM
শিগগিরই অনুতাপ করবে পাকিস্তান

শিগগিরই অনুতাপ করবে পাকিস্তান

গত সপ্তাহের শেষ দিকে পাকিস্তানের গোয়েন্দাপ্রধান ফয়েজ হামিদ কাবুলের সেরেনা হোটেলে পরবর্তী আফগান সরকারের ক্ষমতার ভাগ নিয়ে তালেবান শাসকগোষ্ঠীর মধ্যস্থতা করেন। তিনি আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে।’ কয়েক দিন পর মন্ত্রিসভায় নিয়োগ পান একদল ব্যক্তি, যাঁদের সবাইকে প্রায় দুই দশক ধরে পাকিস্তান আশ্রয় দিয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তান বরাবরই এ ব্যাপারে অস্বীকার করে আসছিল।

হামিদ নির্বাচিত সন্ত্রাসীদের দেশের শীর্ষ নেতা হতে সাহায্য করলেও পশ্চিমারা তাঁকে নিয়ে কী ভাববে সে বিষয়ে তিনি খুব কমই উদ্বেগ দেখিয়েছেন। এর পরিবর্তে তিনি বিজয়ীর বেশে আত্মবিশ্বাসে উজ্জ্বল হয়ে কাবুল ঘুরে বেড়িয়েছেন। তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা সম্প্রতি বহিষ্কৃত আফগান সরকারের অন্যতম প্রধান মিত্র ভারতকে ধাক্কা দেওয়ার জন্য এবং আফগানিস্তানে তাঁদের নিজস্ব ক্লায়েন্ট রাষ্ট্র তৈরি করার জন্য নিজেদের পেছনে ঠেলে দিচ্ছেন।

পাকিস্তান তার মনের গভীরে লালিত ভারতবিরোধী আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ শক্তি ব্যয় করেছে এবং আফগান ভূখণ্ডকে ভারতবিরোধী সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করবে—যেমনটি তারা আগেও করেছিল, যখন আগেরবার তালেবান ক্ষমতায় ছিল। পাকিস্তানও চীনাদের কাছে বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে। বেইজিং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে খনিজ সম্পদ আহরণ এবং কোটি কোটি ডলার খরচ করে একটি অর্থনৈতিক করিডর তৈরির পরিকল্পনা করেছে, যা পাকিস্তান ও আফগানিস্তান হয়ে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত যাবে।

কিন্তু যা পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠার জন্য একটি অর্জন হিসেবে গণ্য হচ্ছে, তা দেশটির জনগণের জন্য একটি ট্র্যাজেডি হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। ইসলামী আমিরাতের প্রতিবেশী হিসেবে নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার ক্রমবর্ধমান কারণ রয়েছে। এদিকে যারা তালেবানের অনুকরণে পাকিস্তানে সর্বাত্মক শরিয়াহ শাসন আরোপ করতে চায়, তাদের কণ্ঠস্বর আরো জোরালো হয়ে উঠবে।

কয়েক দশক ধরে সক্রিয় ইসলামীকরণ একটি বিপুলসংখ্যক পাকিস্তানিকে আরো ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির দিকে ধাবিত করেছে, যা সাংস্কৃতিকভাবে বৈচিত্র্যময় সমাজের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এনেছে। আফগানিস্তানে তালেবান তাদের নিজস্ব ইসলামের প্রকাশ ঘটাচ্ছে। ফলে অনিবার্যভাবেই পাকিস্তান আরো কট্টরপন্থী হয়ে উঠবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

পাকিস্তানি নিরাপত্তা বিশ্লেষক আমির রানা বলেন, যত বেশিসংখ্যক পাকিস্তানি তালেবানের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা চাইবে, তত বেশি ধর্মীয় রাষ্ট্র ও সমাজ প্রচারকারী বিবৃতি মোকাবেলা করা কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি বলেন, ‘তালেবান বিভ্রান্ত পাকিস্তানি যুবকদের জন্য অনুপ্রেরণার একমাত্র উৎস হয়ে উঠবে। ধর্মীয় দলগুলো এরই মধ্যে উদযাপন শুরু করেছে। এটি পাকিস্তানকে আরো তালেবান মতাদর্শী করে গড়ে তুলবে। তালেবানের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় অন্যান্য [সুন্নি নয় এমন] সম্প্রদায় অনিরাপদ বোধ করবে। এই উত্তেজনা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকে বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং সামগ্রিকভাবে সমাজকে আরো অসহিষ্ণু করে তুলবে।’

ভারতবিরোধী প্রচেষ্টায় পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য তালেবান একটি সম্পদ হতে পারে; কিন্তু কৌশলগত সুবিধাগুলো আরো বিস্তৃত হবে কি না সন্দেহ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পাকিস্তানি সূত্রের মতে, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ঘাঁটি করার প্রস্তাব দিতে পারে ইসলামিক স্টেট খোরাসানকে মোকাবেলা করার জন্য, যে সন্ত্রাসীগোষ্ঠী সম্প্রতি কাবুল বিমানবন্দরে হামলা করেছে এবং ১৩ জন আমেরিকান সেনাসহ শতাধিক মানুষকে হত্যা করেছে। পাকিস্তান নিজেকে পশ্চিম ও তালেবানের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে এবং প্রমাণ করতে চাইছে যে তারা তালেবানকে সংস্কারে উৎসাহিত করতে পারে। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে পাকিস্তানের প্রতিশ্রুতির মূল্য কতটা তা বলা বাহুল্য। তালেবানকে পাকিস্তানে নিরাপদে আশ্রয় দিয়ে দেশটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এতটাই খারাপ করে দিয়েছে যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দায়িত্ব নেওয়ার পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে একবার ফোন পর্যন্ত করেননি।

তদুপরি, এমনটাই দেখা যাচ্ছে যে তালেবান তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষকের আদেশ কমই অনুসরণ করছে, যেমনটা পাকিস্তান আশা করে। অন্তত আফগানদের সামনে স্বাধীনতার ভান বজায় রাখতে হলেও তারা এটা করছে। আফগানিস্তানে পাকিস্তানের জনপ্রিয়তা অত্যন্ত কম এবং তালেবান নিজেদের পাকিস্তানের ক্রীড়নক হিসেবে যেন দেখা না যায় সে ব্যাপারে সতর্ক। পাকিস্তানবিরোধী সন্ত্রাসীদের সমর্থন না দেওয়া এবং তাদের হস্তান্তরের ক্ষেত্রে তারা এরই মধ্যে পাকিস্তানের মূল নিরাপত্তার বিষয়গুলো মেনে নিতে নারাজ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাবুল থেকে ফরেন পলিসিকে একজন তালেবান নেতা বলেন, ‘আমরা পাকিস্তানের পুতুল নই, আমরা স্বাধীন। এবং হ্যাঁ, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক রয়েছে।’

তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) সদস্যরা একই ধর্মীয় সেমিনারে প্রশিক্ষণ ও দীক্ষা পেয়েছেন, যা আফগান তালেবান তৈরি করেছিল। এই দলটি অবশ্য পশতুন ইসলামপন্থীদের সমন্বয়ে গঠিত ছিল। এটি পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে কিছু ভয়াবহ হামলা চালায়, এমনকি স্কুলের শিশুদেরও হত্যা করে; অবশেষে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী এদের আফগানিস্তানে ঠেলে দেয়। কিন্তু গত এক বছরে, যখন তাদের আফগান সমসাময়িকরা আবার আফগানিস্তান দখল করার অভিযান শুরু করেছিল, টিটিপির হামলা আবারও বৃদ্ধি পায়। এটি গত মাসে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ৩২টি হামলা চালায়। পাকিস্তানের নীতির একটি নেতিবাচক ফল এই টিটিপি, তবু স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন যে জেনারেলরা মৃত পাকিস্তানিদের নিছক সমান্তরাল ক্ষতি হিসেবে দেখছেন এবং তাঁদের প্রক্সি যুদ্ধের নীতি পরিবর্তন করতে অনিচ্ছুক।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জন্য তৈরি করা একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, আফগান ও পাকিস্তান তালেবান ‘প্রধানত আগের মতো সম্পর্ক’ চালিয়ে গেছে। জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকরা লক্ষ করেছেন যে টিটিপি সাম্প্রতিক অধিগ্রহণে আফগান সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে আফগান তালেবানকে সামরিকভাবে সমর্থন করেছে। আফরাসিয়াব খট্টক, একজন পাকিস্তানি পশতুন নেতা ও বুদ্ধিজীবী বলেছেন, ‘পাকিস্তান রাষ্ট্র নির্বাচিত আফগান সরকারকে এত বছর ধরে টিটিপিকে সমর্থন করার অভিযোগ করেছে; আসলে টিটিপি আফগান তালেবানের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে। আমাদের রাষ্ট্র কতটা ভুল নীতি অনুসরণ করেছে এটি তার একটি নির্দেশক।’

তালেবানের ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে টিটিপি তার সুর কিছুটা নরম করেছে। তারা এখন পাকিস্তানি পশতুনদের প্রাণকেন্দ্র, সীমান্তবর্তী উপজাতীয় এলাকায় স্বায়ত্তশাসন চায়, যেখানে তারা ইসলামী আইনের অধীনে শাসন করতে চায়, ঠিক যেমন তাদের ভাইয়েরা এখন থেকে সীমান্তের ওপারে করবে। আফগান তালেবান টিটিপি বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেনি; কিন্তু বলেছে যে উভয় পাশে পশতুন অধ্যুষিত পাকিস্তানের সঙ্গে অন্তত এক হাজার ৪০০ মাইল বিস্তৃত সীমান্তে অবাধ চলাচল করতে চায় তারা।

খট্টক বলেছেন, তালেবানকে সমর্থন ও টিকিয়ে রাখার পেছনে পুরো ধারণাটি ছিল আফগানিস্তানকে একটি নেতৃত্ব দিয়ে একটি দেশে পরিণত করা, যা তার ধর্মীয় পরিচয়কে তার জাতিগত পরিচয়ের ওপর প্রাধান্য দেয় এবং নিজেকে প্রথমে আফগান নয়, বরং মুসলিম হিসেবে দেখে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদীদের কাছে পূর্ব পাকিস্তানকে হারিয়ে এবার পশতুনদের হারানোর ভয় কাজ করেছে দেশটির মধ্যে। এটি সাংস্কৃতিক অনুরাগের প্রতি আতঙ্কিত হয়ে স্বৈরশাসক মুহাম্মদ জিয়াউল হকের অধীনে ধর্মীয় সমজাতীয়তা ছড়িয়ে দেওয়ার নীতি বেছে নিয়েছে।

খট্টক বলেন, ‘পাকিস্তানের নীতি ছিল আফগান পরিচয় পুনর্নির্মাণের জন্য তালেবানকে ব্যবহার করা এবং আফগানিস্তানের প্রতিনিধিত্বকারী সব কিছু ধ্বংস করা।’ নব্বইয়ের দশকে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর প্রথম যে কাজগুলো করেছিল তার মধ্যে ছিল আফগান রেডিওকে শরিয়াহ রেডিও নামকরণ, বামিয়ানে বুদ্ধমূর্তি ধ্বংস করা, হাজার বছরের পুরনো নববর্ষ উৎসব নভরোজ নিষিদ্ধ করা, আফগান পতাকা বদল করা এবং ঐতিহ্যগতভাবে জনগণের সমাবেশ—যেখানে আফগানরা রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করত, সেই জিরগাকে বন্ধ করা।

ক্ষমতার প্রথম দফায় তালেবান আফগান জাতীয়তাবাদকে দমন করে এবং আফগানিস্তানে চরম ইসলামীকরণ ঘটায়। বছরের পর বছর ধরে এটি পাকিস্তানের ধর্মনিরপেক্ষ পশতুন জাতীয়তাবাদীদের ওপরও আক্রমণ করে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দলটি তার পাকিস্তানি পৃষ্ঠপোষকদের শোষণমূলক দিকও দেখেছে। তালেবান জানে যে স্থলবেষ্টিত আফগানিস্তানের ওপর পাকিস্তানের বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা রয়েছে; কিন্তু তারা যেমন নিজেদের ক্ষমতায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছে, তারা হয়তো টিটিপিকে তাদের প্রভুদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে চাইবে, যারা আশ্রয় দিলেও তাদের অনেক নেতার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছিল।

এমনকি যদি তারা একটি পশতুন বিচ্ছিন্নতাবাদী পরিচয় থেকে দূরে থাকে, তবে জাতিগত সম্পর্ক পাকিস্তানের জেনারেলদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে থাকবে। পাকিস্তান কি সীমান্ত খোলা রাখতে এবং প্রকৃতপক্ষে টিটিপির হাতে নিয়ন্ত্রণ তুলে দিতে রাজি হবে?

পাকিস্তানের উদারপন্থীরা পাকিস্তানের তালেবানীকরণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখবে—যদিও তারা এখন কয়েক দশক ধরে তাদের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। তাই এটি পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য স্পষ্টতই গুরুত্বপূর্ণ নয়। তা সত্ত্বেও তালেবানের প্রত্যাবর্তন এখনো পাকিস্তানের জন্য একটি পিরিহিক বা রক্তক্ষয়ী বিজয় হতে পারে। তালেবান যে ধারণাগুলো পোষণ করেছিল, তারা যে রাষ্ট্রকে বিশ্বাস করে তারা তাদের সুরক্ষা দিচ্ছে তার ভিত্তিগুলোও ক্রমাগত সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে।

 

লেখক : ফরেন পলিসির কলামিস্ট ও বৈরুতভিত্তিক ফ্রিল্যান্স টিভি সংবাদদাতা এবং ভাষ্যকার



পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত


DMCA.com Protection Status
সম্পাদক ও প্রকাশক: নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, ২৫/১ পল্লবী, মিরপুর ১২, ঢাকা- ১২১৬
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
Developed & Maintainance by i2soft