মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর, 2০২1
নাজমুল হক শ্যামল
Published : Monday, 20 September, 2021 at 12:00 AM, Update: 21.09.2021 12:59:18 PM
রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন ও ষড়যন্ত্রের সেই ভয়াবহ স্মৃতি

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন ও ষড়যন্ত্রের সেই ভয়াবহ স্মৃতি

ভুটানের জনসংখ্যা ৮ লাখ, আর বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে ১১ লাখ রোহিঙ্গা। একটি দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়ে বেশি একটি জনগোষ্ঠীর বোঝা বইতে হচ্ছে আমাদের জনবহুল দেশকে। প্রায় চার বছর ধরে তারা এখানে আছে। গত কয়েক দশকে মিয়ানমারে দমন-নিপীড়নের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন এসকল রোহিঙ্গা। শুধুমাত্র ২০১৭ সালের আগস্টেই মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইনের গ্রামে গ্রামে ব্যাপক হত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ শুরু করলে সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশ আসেন।   

আমাদের আর্থিক ক্ষতি ছাড়াও সামাজিক ও পরিবেশের ওপরও বিশাল চাপ সৃষ্টি করেছে তারা। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের প্রশংসা করেছিল। কিন্তু তাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে তারা কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। বরং সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের পূর্ণ শরণার্থীর মর্যাদা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তারমানে দাতা সংস্থাগুলো চাইছে যে তারা এখানেই স্থায়ীভাবে থাকুক। শরণার্থীদের আশ্রয়দাতা দেশে অন্তর্ভুক্ত করাসহ একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে ‘রিফিউজি পলিসি রিফর্ম ফ্রেমওয়ার্ক' নামে ১৬টি দেশের শরণার্থী ব্যবস্থাপনা কাঠামো নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে শরণার্থীদের জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, কাজ, চলাফেরা, জমি কেনা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে সম্পৃক্ত হওয়াসহ সব ধরনের আইনি অধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

রোহিঙ্গা সমস্যার একমাত্র সমাধান হচ্ছে তাদের নিরাপত্তার সাথে মিয়ামনারে ফেরত পাঠানো। এ ধরনের প্রস্তাবের মাধ্যমে বিশ্বব্যাংক মূলত রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার অস্বীকার করছে। কারণ সম্মানজনকভাবে মিয়ানমারে ফেরত যাওয়াটাই হচ্ছে রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার। বিশ্বব্যাংকের প্র্রস্তাবে তাদের সেই অধিকার ব্যাহত হবে। পাশাপাশি ঝুঁকিতে পড়বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা এবং এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরো বেশি জটিল হয়ে পড়বে। বিশ্বব্যাংকের এ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আমাদের কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। জাতীয় স্বার্থে দেশের ভেতরও জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

মিয়ানমারে যে অন্তর্র্বর্তী সরকার আসছে তারা এ ধরনে নৃগোষ্ঠীগুলোর স্বার্থ রক্ষার কথা বলেছে, সেই সুযোগটি গ্রহণ করে তাদের সাথে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে সকলকে, যাতে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো যায়। এরই মধ্যে বাংলাদেশে অবস্থানরত ‘বাস্তুচ্যুত' রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের শরণার্থী নীতি সংস্কার প্রস্তাব প্রযোজ্য না হওয়ায় সরকার তা প্রত্যাখ্যান করেছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই বিষয়ে ঢাকায় সাংবাদিকদের বলেছিলেন, "বাংলাদেশের বিবেচনায় রোহিঙ্গারা ‘শরণার্থী' না হওয়ায় তাদের ক্ষেত্রে প্রতিবেদনের বিষয়গুলো প্রযোজ্য নয়।  আমরা যে রোহিঙ্গাদের রেখেছি তারা নির্যাতিত ও বাস্তুচ্যুত জনগণ, আমরা কিছুদিনের জন্য তাদেরকে এখানে আশ্রয় দিয়েছি। আমাদের অগ্রাধিকার ইস্যু হচ্ছে তারা ফিরে যাবে।” "মিয়ানমারও বলেছে, তাদেরকে নিয়ে যাবে। সুতরাং, এরা সাময়িকভাবে আশ্রয় নেওয়া লোক, তারা শরণার্থী না,” যোগ করেন তিনি।

আসলে বিশ্বব্যাংকে কিছু কথিত বিশেষজ্ঞ আছে, যারা মাঝেমধ্যে এরকম উদ্ভট কাজকর্ম করে। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঠিকভাবেই এর জবাব দিয়েছেন। পদ্মা সেতুর ইস্যুতেও তারা আমাদের দেশের মানুষের আবেগের সাথে, মর্যাদার সাথে দুর্নামের চাদর জড়াতে চেয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি এমন আজগুবি মিথ্যাচার করেছিল পদ্মা সেতুর বিরুদ্ধে যা পরে তাদেরকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। আগের সেই দিন নেই। পদ্মাসেতু নিয়েই তারা কিছু করতে পারেনি, আর এখন কী করবে? তাদের কোনো চাপ বা প্রস্তাবে সায় দেবে না বাংলাদেশ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি তাদের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে সঠিক কাজ করেছেন। তাই বলছি, পদ্মা সেতুর মত বিশ্বব্যাংকের ষড়যন্ত্রের ভয়াবহ স্মৃতিও আর যেনো ফিরে না আসে।

কোনো শরণার্থী বা বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিকে নাগরিক হিসেবে গ্রহণের বিষয়টিতো আশ্রয় দেওয়া দেশের ইচ্ছার ওপরই নির্ভর করে। শরণার্থীদের কথাই বলছি কেন, কোনো দেশের একজন নাগরিকও যদি অন্য একটি দেশের নাগরিকত্ব পেতে ইচ্ছা প্রকাশ করে, তবে তা ওই কাঙ্ক্ষিত দেশের এখতিয়ারের মধ্যেই পড়ে। জোর করে চাপিয়ে দিতে পারে না। এ ক্ষেত্রে তৃতীয় কোনো দেশ বা সংস্থার এখতিয়ার আছে বলে মনে হয় না। এ ধরনের মনোভাব বা চিন্তা-চেতনা উদ্ভট মস্তিষ্কের প্রতিফলন বলেই মনে হয়।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে শরণার্থী বিষয়ে ১৯৫১ সালের কনভেনশন ও ১৯৬৭ সালের প্রটোকল—দুটোই হয়েছে ইউরোপের শরণার্থী সমস্যাকে কেন্দ্র করে। সব দেশের শরণার্থী সমস্যার কারণ ও পটভূমি এক নয়। ১৯৫১ সালের কনভেনশনে বলা আছে, শরণার্থীকে জোর করে ফেরত পাঠানো যাবে না। সেই শর্ত তো বাংলাদেশ মেনেই নিয়েছে। এখান থেকে জোর করে কাউকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে না। কোনো অঘটন ছাড়াই ১১ লাখ রোহিঙ্গা এখানে মোটামুটি নিরাপদেই বসবাস করছেন। এর পেছনে রয়েছে আরো একটি ঐতিহাসিক কারণ। বাংলাদেশ কখনো বিদেশিদের প্রতি বৈরী আচরণ করেনি।

বিশ্বব্যাংক মিয়ানমারে এখন ব্যবসা দেখছে, তারা মানবতা দেখছে না, গণহত্যা দেখছে না। তারা মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে স্বস্তিতে রেখে ব্যবসার পথ খুলতে চাইছে, কিন্তু তা বাংলাদেশ গ্রহণ করবে না। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে ভূ-রাজনীতির চেয়েও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য। আন্তর্জাতিক আদালত মিয়ানমারে গণহত্যা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বলেছেন। কিন্তু তারপরও সব ক্ষমতাধর রাষ্ট্র তাদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করছে। এ ফেব্রুয়ারিতে সেনাবাহিনী ক্ষমতা গ্রহণ করার পর মিয়ানমারে ৯০০ লোককে হত্যা করা হয়েছে। এরপরও পশ্চিমা দেশসহ চীন, জাপান, ভারত, সিঙ্গাপুর ও আসিয়ান দেশগুলো মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে ব্যবসা বন্ধ করেনি।

একটি জনগোষ্ঠীকে তাদের দেশ থেকে উৎখাত করা হয়েছে। এ ব্যাপারে অবশ্যই বিশ্ব সম্প্রদায়ের দায় আছে; বিশেষ করে যেসব দেশ মিয়ানমারের সঙ্গে ব্যবসা করছে, সেখানে বিনিয়োগ করছে, তাদের মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় যে চুক্তি হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে তাদের চাপে রাখতে হবে আমাদের। যেসব দেশ মিয়ানমারের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করছে, বিশেষ করে চীন, জাপান ও ভারতকে যুক্ত হতে হবে রোহিঙ্গা সমস্যার সঙ্গে।

ইতোমধ্যে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) এদের মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সেখানে মিয়ানমার, চীন, ভারত ও রাশিয়ান বিচারকও ছিলেন। কেউ বিরোধিতা করেননি। আদালতের রায় ছিল সর্বসম্মত। আমরা মনে করি, এটি রোহিঙ্গাদের জন্য একটি আইনি স্বীকৃতি।

অবশেষে বলবো, বিশ্বব্যাংকের এ প্রতিবেদন দুঃখজনক ও মিয়ানমারের অন্যায়কে সমর্থন দেয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। এ প্রতিবেদন মানবতার বিপক্ষে প্রস্তাব।  তারা সহায়তার নামে আমাদের ওপর কিছু চাপিয়ে দিতে পারে না। মিয়ানমারে ইউরোপীয় বিনিয়োগ আছে। আমেরিকান বিনিয়োগ আছে। বিশ্বব্যাংক এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে তাদের স্বার্থ রক্ষা করছে বলেই বাংলাদেশের মানুষ মনে করে। তাই আমাদের আশাবাদ, বিশ্বব্যাংক আমাদের সবার সঙ্গে একত্র হয়ে বরং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনেই বাংলাদেশের পাশে থাকবে।

নাজমুল হক শ্যামল: সম্পাদক, দৈনিক নতুন সময়


পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত


DMCA.com Protection Status
সম্পাদক ও প্রকাশক: নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, ২৫/১ পল্লবী, মিরপুর ১২, ঢাকা- ১২১৬
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
Developed & Maintainance by i2soft