শুক্রবার, ২২ অক্টোবর, 2০২1
নতুন সময় প্রতিবেদক
Published : Tuesday, 14 September, 2021 at 8:48 AM


ধর্ষণের পর হত্যার মামলা, পাঁচ বছর পর কিশোরী উদ্ধারপাঁচ বছর আগে ঢাকার ভাটারা এলাকায় এক কিশোরী গৃহকর্মী হিসেবে কাজে গিয়ে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয় বলে অভিযোগ করেছিলেন তার এক স্বজন। এরপর মামলাটি থানা–পুলিশ ঘুরে যায় গোয়েন্দা পুলিশের হাতে। তিন বছর তদন্ত শেষে মেয়েটির কোনো হদিস না দিয়েই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় ডিবি। কয়েক মাস আগে এ মামলার তদন্তের দায়িত্ব পেয়ে মেয়েটিকে উদ্ধার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক মাসুদ খান বলেন, এত দিন ওই কিশোরীকে যৌনকর্মে বাধ্য করেছিল একটি চক্র। যে বাসায় সে কাজে গিয়েছিল, তারাই এটা করেছে। এ কাজে কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলার বাদী মেয়েটির খালাও সহায়তা করেছেন বলে তাদের সন্দেহ।

এ ঘটনায় মেয়েটিকে নির্যাতনে জড়িত অভিযোগে তার গৃহকর্তা, গৃহকর্ত্রীসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মানব পাচার আইনে মামলা হয়েছে। এ মামলায় মেয়েটির খালা বাসনা বেগমকেও খোঁজা হচ্ছে বলে তদন্ত–সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ওই কিশোরীর আইনজীবী আবদুর রহমান খান বলেন, গোপালগঞ্জের ওই কিশোরী আদৌ ধর্ষণের পর খুনের শিকার হয়নি। তার খালা বাসনা বেগম এই মামলা করেছিলেন। পুলিশের তদন্তে যা সত্য, তা বের হয়ে এসেছে। ওই কিশোরীকে দিনের পর দিন আটকে রেখে যৌনকর্মে বাধ্য করেন আসামিরা। কিশোরী এখন তার মায়ের জিম্মায় আছে।

মামলার কাগজপত্র এবং তদন্ত–সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ভুক্তভোগী কিশোরীর গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে। দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা কিশোরীকে ২০১৬ সালের প্রথম দিকে ঢাকায় বসবাস করা খালা বাসনা বেগমের কাছে রেখে যায় তার পরিবার। পরে ওই কিশোরী খালার মাধ্যমে ভাটারায় বসবাসকারী রিনা বেগমের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ শুরু করে। এরপর ওই বছরের ২৪ এপ্রিল গৃহকর্ত্রী রিনা বেগম ভাটারা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, আগের দিন ওই কিশোরী কাউকে না বলে বাসা থেকে বেরিয়ে গেছে। তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

ওই সময় পূর্ব ভাটারার চিতাখোলা সেতুর কাছে এক কিশোরীর লাশ উদ্ধার হয়। তখন এই কিশোরীর খালা বাসনা বেগমসহ তাঁর বাবা-মা দাবি করেন, খুন হওয়া ওই কিশোরীই তাঁদের মেয়ে। তখন ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ এনে থানায় মামলা করতে গেলে তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরে বাসনা বেগম ওই কিশোরীকে তাঁর বোনের মেয়ে দাবি করে ২০১৬ সালের ১৪ জুন ঢাকার ৪ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে গৃহকর্ত্রী রিনা বেগমসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ এনে মামলা করেন। আদালত তখন ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) অভিযোগটি এজাহার হিসেবে নিয়ে তা তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

আদালতের নির্দেশনা পেয়ে প্রথমে ভাটারা থানা-পুলিশ তদন্তে নামে। এরপর মামলাটির তদন্তভার পায় ঢাকা মহানগর ডিবি পুলিশ। লাশ উদ্ধার হওয়া কিশোরীই ওই মেয়ে কি না, তা বের করতে তাঁর মা–বাবার ডিএনএ নমুনা নিয়ে সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। সিআইডি আদালতকে জানায়, নিহত কিশোরীর ডিএনএ নমুনার সঙ্গে গোপালগঞ্জের কিশোরীর মা–বাবার ডিএনএ মেলেনি।

এদিকে ডিবি পুলিশ মামলার আসামি রিনা বেগম, তাঁর স্বামী বাছের মিয়া, ছেলে রাব্বি, আলামিন ও সোহাগ ব্যাপারী নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের মধ্যে সোহাগ ব্যাপারী পুলিশকে বলেন, ২০১৬ সালের ২২ এপ্রিল ওই কিশোরীকে তাঁর হাতে তুলে দেন আসামি রিনা বেগম। তিনি গুলশানের একটি বাসায় নিয়ে মেয়েটিকে ধর্ষণ করেন। পরে ওই কিশোরী কোথায় গেছে, সে বিষয়ে তাঁর কিছু জানা নেই।

এরপর ২০১৯ সালের ৩০ জুন ঢাকার সিএমএম আদালতে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় ডিবি। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভাটারা থেকে উদ্ধার হওয়া মৃত কিশোরী গোপালগঞ্জের কিশোরী নয়। এ জন্য রিনা বেগমসহ অন্যদের অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন করে ডিবি পুলিশ। এরপর মামলার বাদী বাসনা বেগম ডিবির দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দিলে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ৯ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল পিবিআইকে মামলাটি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন।
তিন বছরে গোয়েন্দা পুলিশের তিনজন কর্মকর্তা মামলাটি তদন্ত করেন। তাঁদের একজন ২০১৮ সালে ডিবির পরিদর্শক নিরু মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ওই কিশোরীকে উদ্ধারের ‘সব চেষ্টাই’ তাঁরা করেছিলেন। কিন্তু পারেননি।

পিবিআই টানা সাত মাস তদন্ত করে ৭ সেপ্টেম্বর মাদারীপুর থেকে মেয়েটিকে উদ্ধার করে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক মাসুদ খান বলেন, মেয়েটির আপন খালা বাসনা বেগম প্রলোভনে পড়ে তাঁকে আসামি রিনা বেগমের কাছে তুলে দেন। এরপর রিনা বেগম, তাঁর স্বামীসহ অন্যরা ওই কিশোরীকে প্রায় পাঁচ বছর আটকে রেখে তাকে যৌনকর্মে বাধ্য করেন। পুরো বিষয়টি ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্য ওই কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে মিথ্যা মামলা করা হয়েছিল। কিশোরী উদ্ধার হওয়ার পর পুলিশ ও আদালতে দিনের পর দিন নির্যাতিত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে। কিশোরীর খালা বাসনা বেগমসহ ছয়জনের নামে মানব পাচার আইনে মামলা করা হয়েছে।

পাঁচ বছর পর এই কিশোরী উদ্ধার হলেও পূর্ব ভাটারার চিতাখোলায় যার ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার হয়েছিল, সেই মেয়েটির পরিচয় আজও বের করতে পারেনি পুলিশ। তার লাশ উদ্ধারের ঘটনায় ভাটারা থানায় একটি হত্যা মামলা হয়।
ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের সহকারী পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা অনেক চেষ্টা করছি, কিন্তু তার পরিচয় বের করতে পারিনি। ময়নাতদন্তের তথ্য অনুযায়ী, কিশোরীকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়। কিন্তু আমরা খুনি কিংবা কিশোরীর পরিচয় এখনো বের করতে পারিনি। তবে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’

আসামিপক্ষের আইনজীবী হাবিবুর রহমান বলেছেন, পুলিশ যে অভিযোগ করেছে তা ঠিক নয়।





পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত


DMCA.com Protection Status
সম্পাদক ও প্রকাশক: নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, ২৫/১ পল্লবী, মিরপুর ১২, ঢাকা- ১২১৬
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
Developed & Maintainance by i2soft