বুধবার, ০৮ ডিসেম্বর, 2০২1
তৌহিদ এলাহী
Published : Tuesday, 26 January, 2021 at 11:01 PM
স্বপ্নগুলো ঘরে তুলি

স্বপ্নগুলো ঘরে তুলি

এ এক বিস্ময়কর ঘটনা। একদিনে প্রায় ৬৬০০০ পরিবারকে ঘর করে দেয়া? তাও সাদামাটা টিনের বেড়া দেয়া কাচা ঘর নয়, আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত রান্নাঘর, এটাচড বাথরুমসহ দুটি ব্যবহারযোগ্য রুম। সামনে প্রশস্ত বারান্দা, উপরে রংগিন ঢেউটিন, রয়েছে পর্যাপ্ত জানালা-দরজা। আর সবমিলিয়ে ২ শতাংশ সরকারী খাস জমি ঘরের সাথে কবুলিয়ত দলিল করে দেয়া।

আপনি কি খুব কঠিন হৃদয়ের কেউ? অন্যের সুখ আর ভাললাগা আপনার চোখে আনন্দাশ্রু এনেছিল কখনো? আসুন আমার কাছে, আমি কয়েকজন উপকারভোগীর কাছে নিয়ে যাব। আপনার কিছু করতে হবে না,  শুধু ঘর নিয়ে দু একটা কথা তাদের জিজ্ঞেস করবেন, বাকিটা ম্যাজিক।তাদের স্ফুর্তি আর আবেগ দেখে কখন আপনার দুচোখ ছলছল করবে আপনি বুঝতেও পারবেন না। এদের সাথে একান্তে কথা বলতে গেলে আমি সানগ্লাস ব্যবহার করি। অন্যের সামনে চোখ মুছতে আমার লজ্জা লাগে।

দেশের প্রত্যন্ত দূরের একটি ছোট্ট একটি উপজেলায় কাজ করি, জনসংখ্যা একলাখের কিছু বেশি। তিনধাপে (২২০+১০০+৫০=) ৩৭০ এর টি বেশি ঘরের বরাদ্দ আলফাডাংগার জন্য এনে দিয়েছেন জেলা প্রশাসক স্যার। এর মধ্যে প্রথম ধাপের ঘরগুলোর কাজ বেশিরভাগ শেষ। প্রতি ঘরের জন্য বরাদ্দ এক লাখ পচাত্তর হাজার টাকা।

টাকার অংক শুনে আর ঘরের বর্ণনা শুনে আপনার কি অনুভুতি হয়েছে জানি না, ইউনিভার্সিটির ক্লাসে বা ট্রেইং এর পড়ায় যতটুকু প্রজেক্ট, অপারেশন ও সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট যা শিখেছি, তার চেয়ে দশ গুণ শিক্ষা দিয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের কাজ। সঠিক উপকারভোগী যাচাই ও প্রকল্পের জন্য ঘর করার উপযোগী উচু খাস জমি বের করা সবচেয়ে কঠিনতম অংশ। দেশের খাস জমি যারা বেদখল করে খায়, তারা আর যাই হোক নীরিহ কেউ না। এক ইঞ্চি জমি বের করতে মাথার ১০০ চুল পড়ে যাবে। মামলা হামলা হুমকি -ধামকি, পত্রিকায় রিপোর্ট করানো, দখলদারদের যার যে ক্ষমতা আছে সবগুলোই ব্রক্ষ্মাস্ত্রই তারা প্রয়োগ করেছে ইউএনও ও এসি ল্যান্ডদের বিরুদ্ধে। আবার যেহেতু ঘর করা হবে সরকারী খাস জমিতে, তাই সে জায়গায় বসবাস করতে ইচ্ছুক অসহায়, দরিদ্র, ভিক্ষুক, বিধবা স্বামী পরিত্যাক্তা নিম্নআয়ের খুজে বের করতে নিজেকেই যেতে হয়েছে বাড়ি বাড়ি। একটু ঢিল দিলেই কখন নাম লিস্টে ঢুকানোর কথা বলে টাকা পয়সার চালাচালি করে দেবে বুঝতেই পারবেন না। আর খরচ সাস্র‍য়ের জন্য যত ধরণের বিজনেস ও কমিউনিকেশিন সেন্স কাজে লাগানো যায়, সবগুলো প্রয়োগ না করলে ভাল উপকরণ দিয়ে মানসম্পন্ন ঘর করা অসম্ভব। নিজের অভিজ্ঞতায় বলি, টাকা পাওয়ার সাথে সাথে ইটভাটার মালিক, সিমেন্ট বালি আর টিনের ডিলারদের ডেকে নিয়ে অগ্রিম পুরো টাকা হাতে তুলে দিয়ে বলেছি, যান নিয়ে যান- জিনিসগুলো সময়মত পৌছায়ে দেবেন। তারা সেভাবে লাভ হয়ত করতে পারে নি, আশ্রয়ন প্রকল্পের নাম শুনে নিজে থেকেই কিছু দাম কম নিয়েছে এবং অগ্রিম টাকা নেয়ার কারণে তাদের অনেকটা পুষিয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞ অর্থনীতির দৃষ্টিতে দেখলেও, করোনা পরবর্তী স্তিমিত অর্থনীতির জন্য বিরাট এক আশীর্বাদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ন প্রকল্পের এ ঘরগুলো। কেইনেসিয়ান ইকনোমিক্স এর তত্বানুসারে, বাজারে টাকা বা মুদ্রার ফলপ্রসু কন্ট্রিবিউশন মাপার জন্য দেখা হয় মাল্টিপ্লাইয়ার ইফেক্টকে। অর্থাত কেন্দ্রিয় ব্যাংকের ছাপানো একটাকা সরকারী খরচের মাধ্যমে কতজনের হাতবদল হয়ে ঘুরতে থাকবে, যতবেশি হাতবদল হবে অর্থনীতি ততবেশি গতিশীল হবে। মানুষের হাতে টাকা যাবে, খরচ হবে,আরেকজন পাবে -এভাবেই অর্থনীতি এগিয়ে যাবে।

উপজেলা পর্যায়ের এ ঘরগুলোর তৈরির জন্য সরাসরি টাকা উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। তাই স্থানীয় ভাবেই ব্যায়ের জন্য মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট কাজ করেছে অনেকগুণ বেশি। প্রতিটা ঘরের জন্য ইট, বালু , টিন, কাঠ, দরজা জানালা, বাথরুম প্যান, স্লাব, রড, মাটি, নাটবল্টু ইত্যাদির সাপ্লাই চেইন ও ঘর নির্মাণের জন্য লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কাজ করছে। প্রদত্ত টাকার কমবেশি দু-তৃতীয়াংশ চলে গেছে বিভিন্ন নিম্ন আয়ের ফ্যাকটরি শ্রমিক,  দিনমজুর বা মিস্ত্রি পেশার লোকজনের হাতে। এরা যা পায় তা দিয়ে চালু রেখেছে গ্রামের চাল, ডাল,কাপড় ও নাম অজানা কত শত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসায়ি, শ্রমিক ও কৃষকের জীবন। এভাবেই টাকা ফ্লাই করছে, মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট কাজ করছে, ঘর গুলো হয়ে উঠেছে করোনা পরবর্তী গ্রামীন অর্থনীতির সঞ্জীবনি শক্তি।

অতিদ্রুত, প্রায় দুমাস সময়ের মধ্যে ছিষট্টি হাজার মানসম্পন্ন ঘর তৈরি মাঠ পর্যায়ে উপজেলা প্রশাসনের সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ। এ অভিজ্ঞতা আমাদের পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন-২০০৬ ও প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা-২০০৮ দ্বারা সরকারী কর্মকান্ড ক্রয় ও ব্যায় পলিসিতে প্যারাডাইম শিফট এনে দিতে পারে। এ ঘরগুলোর জন্য অনুসরণকৃত ডিরেক্ট পারচেইজড মেথড (ডিপিএম) স্বল্পব্যায়ের অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে টেন্ডারের জন্য অতিরিক্ত ধাপ, সময় ও খরচ ( টেন্ডার প্রফিট ১০%) বেচে যাবে। সরকার নিজে কাজ করায় মান বেড়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে বেশি। সরকার অল্প টাকায় দ্রুত বেশি কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করবে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের নেতৃত্বে এ প্রকল্পে নানাভাবে সাহায্য করেছেন এসি ল্যান্ডগণ, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা, উপজেলা প্রকৌশলী, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও মেম্বারগণ। নির্মাণ সামগ্রী চুরি ঠেকানোর জন্য গ্রাম পুলিশ রাখছে শক্তিশালী ভূমিকা, থানা পুলিশ নিয়মিত টহলের ব্যবস্থা করেছে। এলাকার মাননীয় সাংসদগণ, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজ, মিডিয়া নানা ধাপে সাহায্য করছেন, ঘরের কাজে মিনিটরিং করেছেন, উপকারভোগী নির্বাচনে সহায়তা করেছেন। জেলা প্রশাসকগণ সারা জেলায় কাজের অগ্রগতি ও মান নিশ্চিতকরণে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন।

এখনো গ্রামে বিত্তশালীদের নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, যা আমাদের প্রচলিত অর্থনীতির তত্বীয় সংজ্ঞায় পাওয়া যায় না। যেমন, জনাব কেরামত আলি বিত্তশালী ধনী মানুষ বড়লোক, কারণ তার ঘর পাকা, ইটের দেয়াল। আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের প্রাথমিকভাবে নির্মিত ছিষট্টি হাজার ঘর অনাদিকালের এই সংজ্ঞায়ন ও ধনী-গরিবের শ্রেণি ব্যবস্থায় বড় একটি ঝাকুনি দিয়েছে। হঠাৎ করেই এই ছিষট্টি হাজার অসহায়, ছিন্নমূল, ভুমিহীন, ঘরহীন মানুষ আজ আলাদ্দিনের আশ্চর্য প্রদিপের ছোয়ায় কেরামত আলীর মত পাকা ঘরের বিত্তশালীমালিক।

ধন্যবাদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আলাদ্দিনের প্রদিপে ছুয়ে দেয়ার জন্য, স্বপ্নকে বাস্তবে নামিয়ে আনার জন্য।

স্বপ্নগুলো আজ পাকা ঘরে তোলার দিন।

লেখক: তৌহিদ এলাহী
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, আলফাডাঙ্গা, ফরিদপুর


পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত


DMCA.com Protection Status
সম্পাদক ও প্রকাশক: নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, ২৫/১ পল্লবী, মিরপুর ১২, ঢাকা- ১২১৬
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
Developed & Maintainance by i2soft